মঞ্চক

তুমি যখন বই পড়ো তখন তুমি সিদ্ধার্থ
তুমি যখন ছবি আকো তখন তুমি ঈশ্বর
তুমি যখন লেখো, তখন তুমি গভীর
আমাকে যখন ভালোবাসো, তখন তুমি প্রকৃতি

শুধু মাত্র দৃষ্টির আড়ালে থাকো যখন , তুমি হয়ে যাও অন্ধকার, কুৎসিত, ভয়ংকর এক দানব
যে কিনা বৃশ্চিকের সংস্পর্শে বিষময় হয়ে শুধুমাত্র এক বিভীষিকাময় বিভিষণ বা সীতাবধকারি রাবণ !

hereiam

শেকড়হীন স্মৃতির নি:শব্দ আর্তনাদ

3863235739_b158a2a296

Colombia is a country full of widows.There was one widow, the widow of a political leader, who told me how difficultit was to continue living with objects that are reminders of her husband. Everymorning you open the closet and the clothing is there. Every day you sit at thedining table and the empty chair is there, screaming the absence of thatperson. It can become a very difficult object to live with.—Doris Salcedo

সমসাময়িক শিল্পকলার জগতে, বিশেষ করে ভার্স্কয ও স্হাপনা শিল্পের মতো বেশ র্দুলভ সৃষ্টিশীল শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে, কলোম্বিয়ান শিল্পী ডরিস সালসেদোর নাম উঠে আসে বিশেষ গুরুত্বের সাথে । শিল্পী ডরিস সালসেদোর শিল্পকর্ম রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবিত (Political Art ) শিল্প বলে সংজ্ঞায়িত করা হলেও, তাঁর শিল্পকর্মে ব্যক্তিগত জীবন, আর সেই জীবনের সীমানা পেরিয়ে ল্যাটিন আমেরিকার সামরিক একনায়কতন্ত্রগুলোর গণতন্ত্রহীনতা ও মানবাধিকারহীনতার সেই কৃষ্ণ অধ্যায়ের সমষ্ঠিগত অভিজ্ঞতার বিভীষিকাময় স্মৃতির বলিষ্ঠ প্রকাশ, সে কাজগুলো যতটা না রাজনৈতিক অভিক্ষেপ, তারচেয়েও অনেক বেশী নিপীড়িত মানুষের বিস্মরনের বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম, জমাট বাধা নি:শব্দ আর্তনাদ যা সময়ের শরীরের আচড় কেটে জানান দেয় দু:শাসনের বিরুদ্ধে মানবতার নিরন্তর সংগ্রামকে।

ল্যাটিন আমেরিকার দেশ কলোম্বিয়া তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ও কর্ম জীবন । শিক্ষা জীবনের শেষ ধাপ স্নাতোকত্তর ডিগ্রির জন্য আমেরিকা পাড়ি জমালেও , শিক্ষা শেষে ফিরে যান নিজ জন্মভুমিতে ও শিক্ষকতা শুরু করেন সেখানে। তাঁর স্বদেশে , যেখানে সামরিক শাসনের বিভীষিকা তছনছ করে দিয়েছিলো সাধারণ মানুষের জীবন, শোষক গোষ্ঠির নির্যাতনের শিকার হয় সাধারন মানুষ। ভুলুণ্ঠিত মানবাধিকার আর গণতন্ত্রহীনতার অন্ধকারে মানুষের হাহাকার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে অসহায় জীবনের দেয়ালে দেয়ালে । শিল্পী ডরিস নিজের ও তাঁর বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনকে হারিয়েছেন সেই দু:স্বপ্নসম গ্রহনকালে, দেখেছেন প্রিয়জনদের দূর্ভোগ। পরবর্তীতে সেই সব অভিজ্ঞতা লব্ধ স্মৃতিকথন তাঁর নান্দনিক স্পর্শে , তাঁর সৃষ্টি শিল্পকর্মের মাধ্যমে অভিব্যক্ত হতে থাকে । আজো হচ্ছে . . .

১৯৫৮ সালে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ কলোম্বিয়াতে জন্ম গ্রহনকারি এই শিল্পী লন্ডনের টেট মর্ডানের ৮ম আমন্ত্রিত শিল্পী যিনি তাঁর শিল্পকর্ম সেখানে প্রর্দশন করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। আমার ডরিস সালসেদোর শিল্পকর্ম দেখাবার সুযোগ হয়েছিলো প্রথম, লন্ডনের টেট মর্ডানের গ্যালারীর ছাই রঙা হিম শীতল একটি কক্ষের মধ্যে। সেই শিল্পকর্মটি আমার মনে এত গভীরভাবে দাগ কেটেছিলো যে , আমি সহজেই অনুধাবন করতে পেরেছিলাম তাঁর শিল্পকর্মের মর্মকথা । আমি যেনো নিজেকে দেখতে পেলাম সেই সিমেন্ট-কাঠের আয়নায় ।

শিল্পকর্মটি ছিলো একটা ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্য । একটা কাঠের আলমারিকে, সিমেন্ট দিয়ে লেপে অনেক খানি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ; তবুও তার কাঠের শরীরের অবয়ব দৃশ্যমান । দেখে যেনো মনে হয় একটা কফিন কে খাড়া করে দাড় করিয়ে দিলে যেমন হবে । যে কফিনটাকে খোলা যাবে না আর কোনো দিনো । হয়তো সেখানে শুয়ে আছে মৃত কোনো শরীর । যে শরীরটা একদিন জীবন্তু ছিলো । ছিলো প্রানবন্ত , বাঙ্ময় । আজ আর সে কথা বলবে না । সে তার ভেতরে সমস্ত স্মৃতি নিয়ে শুয়ে আছে কফিনের মধ্যে । সে নিজে আজ হয়ে গেছে স্মৃতি । জমে গেছে কালের গভীরে শীলা খন্ডের মতো ।

অতীত রয়ে যায় পিছে, অতীত স্মৃতি হয়ে যায়, স্মৃতিও জমে হয়ে যায় পাথর একদিন …শিল্পী ডরিস সালসেদোর সৃষ্টিকে যত দেখেছি তত হয়েছি মুগ্ধ, যত জেনেছি তত হয়েছি বিস্মিত । শিল্পিী ডরিস সালসেদোর কাজ সমসাময়িক শিল্পকলার পরিমন্ডলে অত্যন্ত সমাদৃত ও স্বতন্ত্র । বিভিন্ন আটপৌড়ে আসবাবকে জোড়াতালি দিয়ে তিনি গড়ে তোলেন তাঁর ভাস্কর্য স্বরুপ শিল্পকর্ম গুলো । টেবিলের সঙেগ খাট জোড়া দিয়ে , আলমারির সঙ্গে বেইয়ের তাক অথবা কিছুটা অংশ পুড়িয়ে বা মাটি ও সিমেন্ট লেপে তিনি বদলে ফেলেন মূল আসবাবটির চরিত্র। বেন্চ এর উপর বেন্চ বসিয়ে , মাঝে মাটির স্তরে বেড়ে উঠতে দেন ঘাসের চারা। শিশুদের দোলনাকে মুড়ে দেন দড়িতে বোনা জালের ভেতরে …এমন অভিনব চিন্তা ও তাঁর প্রকাশ ও অভিব্যাক্তি অনবদ্য । তার শিল্পকর্ম দেখলে মনে হয় মানুষের বুকের ভেতরের হাহাকার , তাঁর হাতের স্পর্শে সৃষ্ট শিল্প একাকার হয়ে যায় ….. শিল্পী ডরিস সালসেদো শিল্প সৃষ্টির প্রক্রিয়াতে বেশী সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠেন ; তিনি সেই সব আসবাবপত্রে মানুষের চুল, দাঁত বা হাড় চামড়াকে বসিয়ে দেন সুনিপুন ভাবে । ছিড়ে যাওয়া কাপড়ের অংশ, পোষাকের লেস কে এমন ভাবে তিনি স্হাপন করেন স্হাপনা শিল্পে যে মনে হয় এটাই আসবাবটার অংশ। সেই টুকরো কাপড়টুকু বলে যায় হাজারো কথা যেনো । এভাবেই নানা শিল্প প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে শিল্পী তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে মানুষের ফেলে আসা অতীতকে দেখাতে চান ।

যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশ বা রাজনৈতিক ভাবে অস্হির দেশে মানুষ কে মুখোমুখি হতে হয় নানা ধরনের তিক্ততার বা বিভীষিকার । নিজেদের স্হায়ী ঘরবাড়ি ফেলে, পালাতে হয় নিরুদ্দেশে বা নিজেদের ঘরেই হতে হয় নির্যাতনের শিকার । নিজেদের আবাস কারো কারো জন্য হয় সমাধি স্হল বা কবরস্হান । সেই রাজনৈতিক অস্হিরতায় সাধারণ মানুষকে নিজেদের চিরচেনা প্রিয় সংসার আসবাব ফেলে পা বাড়াতে হয় অন্ধকারের দিকে । পেছনে রয়ে যায় কত স্মৃতি , কত বেদনা কত কষ্টের ইতিহাস । জমে জেম যা হয় শুধুই স্মৃতির স্তুপ ।

শিল্পী ডরিস সালসেদোকে তাঁর কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে , তিনি এক শব্দে বলবেন ’স্মৃতি ’ বা ’মেমোরী ’; আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলবো ৭১ এর স্মৃতিকথা ।

কামিল ক্লদেল : বিস্মরনের অতলে সৃষ্টির যাদুকর …

কেউ যদি শিল্পী কামিল ক্লদেলের জীবন সম্পর্কে জেনে থাকেন, তবে অবশ্যই জার্মান দার্শনিক নীচাহ‘র ভালোবাসায় উন্মাদনা নিয়ে সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে যাবে, “ভালোবাসায় পাগলামো থাকে, কিন্ত কারন থাকে পাগলামোতেও।” বিনা কারনে এই পৃথিবীতে তো কিছুই তো ঘটবার নয় আর অনেক কিছু ঘটে যাবার পরে মনে হয়, এমন কোনো ঘটনার পুণরাবৃত্তি যেন না হয় আর এই পৃথিবীতে। যার কারনগুলো চিহ্ণিত করতে গেলেই বরং বেশী অকারন মনে হবে। জীবন ও প্রকৃতিকে মনে হবে অর্থহীন, শুন্য ও অসাড়। জীবনের পরে মৃত্যুর দেশে পা রেখেও যে আত্মা তৃপ্ত হতে পারেনি, এমন অকারনের কারণ খুঁজতে গেলেও, মানে প্রশ্ন জাগতে পারে; একজন মানুষের মৃত্যুর পরে কতটুকু জায়গার প্রয়োজন?

উত্তরটা সকলের জানা, সাড়ে তিন হাত জায়গা, এর বেশী তো নয়। বেঁচে থাকতেই বা একজন সাধারন নির্লোভ মানুষের কতটুকুই বা প্রয়োজন। অর যদি সে শিল্পী হয়, “প্রকৃত শিল্পী ”।
তবে তাঁর চাহিদাও তো বেশী হবার কথা নয়। খেয়ে পরে বেঁচে নিজের শিল্প স্বত্তাকে বাঁচিয়ে রাখা … এইতো। কোনো জাগতিক বস্তুর প্রতি যার কোনো লোভ নেই। সেই নির্মোহ , জাতশিল্পী যে, যে জন্ম গ্রহন করেছে প্রতিভা নিয়ে, তাঁর ভেতরে যে কল্পনার খনি; তা চাষাবাদের জন্য যেটুকু জমি আর তাঁর স্বপ্নকে উড়তে দেয়ার জন্য যেটুকু আকাশ প্রয়োজন, তার বেশীতো কোনোদিনো, কেনো প্রকৃত শিল্পী কারো কাছে প্রত্যাশা করেনি।
শিল্পী কামিল ক্লদেলও চেয়েছিলেন নিজ যোগ্যতায়, খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে আর নিজের শিল্প স্বত্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে। অবশ্য এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে আজো যোগ্যতা, সাফল্যের জন্য তেমন বড় একটা মাপকাঠি নয়। ভাগ্য বার বার বদলে দিয়ে যায় সব কিছু ; নিজ যোগ্যতায় সাজানো কলপনার প্রাসাদকে, ভেঙ্গে ফেলে ঠুনকো তাসের ঘরের মতো।
সেই তাসের ঘরের মতো সাজানো পরিপাটি পরিবারে, জটিল ও প্রানহীন মানব সমাজে , যদিও মাতৃত্বের মুল্য চড়া দামে নিলামে চড়ে, তবু কিছু মানুষের ভাগ্য এতটা সুপ্রসন্ন নয় যে মাতৃ ভালোসাবায় সিক্ত হবে সে জীবন , হবে উর্বর , হবে সফল। কারো বা সেই দুর্ভাগ্যের মুল্য পরিশোধের জন্য বিলিয়ে দিতে হয় নিজের জীবন , বিকিয়ে দিতে হয় অর্জিত সম্মান। মনোবিজ্ঞানীরা দাবী করে থাকেন , শৈশবে মাতৃ-ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত এমন মানুষেদেরই শেষ পরিনতি হয়; কঠিন কঠোর শিল্পী জীবন। দীর্ঘ এই ভুমিকার গল্পটা কিন্তু নাতিদীর্ঘ । শিল্পী কামিল ক্লদেল বা ভাস্কর কামিল ক্লদেল , যাঁর জন্ম হয়েছিল পৃথিবীর উন্নত সভ্য দেশ ফ্রান্সে ১৮৬৪ সালের ৮ ডিসেম্বরে এবং দীর্ঘ ৭৮ বছরের যন্ত্রনাময় জীবন যাপনের পর ১৯৪৩ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি মৃত্যু বরন করেন।
অল্প বয়সেই তাঁর শিল্প প্রতিভা প্রস্ফুটিত হয়েছিল। বাবার উৎসাহে তিনি শিল্পী হবার শিক্ষা নেয়ার সৌভাগ্যও লাভ করেন; সে সুত্রে ১৮৮১ থেকে জীবন শুরু হয় পারীতে , মা , বোন আর ছোট ভাই পলের সাথে । শৈশবেই পাথর আর মাটির প্রতি অদম্য আকর্ষন কামিলের শিল্পী সত্ত্বার জানান দিয়েছিল, ভাস্কর আলফ্রেড বোশে র কাছে আকাদেমী কোলারসি তে প্রথম শিল্পী হবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় তরুনী কামিলের। সে সময় কিন্তু নারীদের জন্য রুদ্ধ ছিল একোল দে বোজার্ট (École des Beaux-Arts) এর রক্ষনশীল দরজা।
তবে কামিলের সম্ভাবনা নজর এড়ায়নি অনেকেরই, একোল দে বোজার্ট এরই পরিচালক পল দুবোয়া ১৮৮২ সালে, রঁদ্যার সাথে প্রতিশ্রুতিময় কামিল ক্লদেলকে পরিচয় করিয়ে দেন; ভাস্কর রদ্যাঁর উপর শিক্ষাদানের দায়িত্ব পড়ে এবং কামিল রদ্যাঁর ওয়ার্কশপে যোগ দেন। সেখান থেকেই এই ভয়ানক হৃদয় বিদারক গল্পের সুচনা । শুরু হলো ভালোবাসা নামক এক অলীক স্বপ্নের । যার মাশুল শুধু একা কামিলকেই দিতে হয়েছিলো , নিজের জীবন দিয়ে, নিজের শিল্পী স্বত্তাকে বিসর্জন দিয়ে ।
ভাস্কর রদ্যাঁ যখন রেনেসাঁর শিল্পী মাইকেলএন্জেলো ও ধ্রুপদী কবি দান্তের প্রভাবে অনুপ্রানিত হয়ে কাজ করছেন , তখন তাঁর জীবনে সত্যিকার ভালোবাসা, তীব্র আবেগ আর রোমাঞ্চকর অনুভুতির জোয়ার এনে দেয় তরুনী মেধাবী শিল্পী কামিল।

তাদের দীর্ঘ দিনের গভীর সম্পর্ক পরস্পরের কাজকেই সমানভাবে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করা হয় যদিও, তবে কামিল রদ্যাঁর কাজকে প্রভাবিত করেছিলেন ভিন্ন একটি মাত্রায় ও গভীরভাবে, যা সুস্পষ্ট হয় কামিলের সাথে পরিচিত হবার আগে এবং পরে করা রদ্যাঁর কাজগুলো যদি তুলনা করা হয়। ভাস্কর রদ্যাঁকে কামিল তার কাজে ডেকোরেটিভ স্টাইল ভেঙ্গে বের হয়ে আসতে সাহায্য করেছিলেন। কামিলের প্রভাবেই রদ্যাঁর কাজগুলো হয়ে উঠেছিল আরো বেশী আবেগময়, অনুভুতি সিক্ত, অর্থবহ, অভিব্যাক্তিময়, যা পরবর্তীতে রদ্যাঁর অনন্য নিজস্বতা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন শিল্পসমালোচকরা।

ধীরে ধীরে রদ্যাঁর কাজে স্পষ্ট হয় আধুনিকতা; একসাথে জড়ো হয়ে থাকা ফিগারকে ভেঙ্গে রদ্যাঁ শিখেছিলেন একক বিষয়বস্তু ভিত্তিক কাজ করতে সাহসী হয়ে উঠতে, শিল্পী রদ্যাঁ এর নতুন করে পাওয়া এই আবেগময় আত্মবিশ্বাস দর্শকের স্পর্শ করেছিল সহজেই । রদ্যাঁর জনপ্রিয়তাও দিন দিন আকাশচুম্বি হতে থাকে আর কামিল পা বাড়ায় অবহেলার এক অন্ধকার জগতের দিকে।

১৯৮২ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত কামিল ও রদ্যাঁর গভীর সম্পর্ক তাদের শিল্পচর্চাকে এমন ভাবে প্রভাবিত করে যে, রঁদ্যার কাজে নারী-পুরুষের শারীরিক ভালোবাসার উন্মত্ততা দেখা যায়। আর কামিল তো অল্পবয়স থেকেই তীব্র আবেগময়ী। কামিলের কাজ তখন সময়ের অনেক আগেই ডানা মেলেছে বলে ঠিক মতো কেউই তাকে মুল্যায়ন করতে পারেনি। সেটা বোঝার মত বোদ্ধা শিল্পরসিকের সংখ্যাও খুব কম ছিলো তখন।
রদ্যাঁ কামিলকে বিয়ে করে সামাজিক সম্পর্কে আবদ্ধ করতে অস্বীকার করলে, কামিল মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলেন । মনে করা হয়, সে কারনেই কামিল বেশ কয়েকবার গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেন, অথবা সন্তার জন্মদানের পরে , দান করে দেয়া হয় । কামিল সেসব দু;সহ যন্ত্রনার স্মৃতি ভুলতে পারেননি কোনোদিনো । ভাস্কর রঁদ্যার সাথে কামিল এর বয়সের ব্যবধান ছিলো অনেক , প্রায় ২৪ বছর।
গল্পের অন্যদিকে তাকালে দেখা যাবে যে, রদ্যাঁর সাথে অন্য এক রমনীর তখন সম্পর্ক ছিলো দীর্ঘদিনের। সাধারন প্রতিভাহীন এক রমনী , নাম রোজ বিউরেট। রঁদ্যার মডেল ছিলো রোজ । রঁদ্যার একটি সন্তানের মাও ছিলো সে, যদিও সব কিছুই ছিলো সমাজে বেশ গোপনীয় এবং তাদের মৃত্যুর অল্প কিছু দিন আগে, ১৯১৭ সালে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন ।
রদ্যাঁ কামিল ও রোজ দুজনের সঙ্গেই একই সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী ছিলেন সেবিষয়ে তাতে কোনো সন্দেহ নেই । কিন্তু কামিলের পক্ষে তার ভালোবাসাকে ভাগ করে নেয়া সম্ভব ছিলো না যেমন, ঠিক তেমনই অসম্ভব ছিলো রঁদ্যার এই দ্বিচারী মনোভাবকে মেনে নেয়া। এরপর কামিল রঁদ্যার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয় চিরদিনের জন্য। দীর্ঘ প্রায় তের – চৌদ্দ বছরের সম্পর্কের কোনো গন্তব্য না দেখে কামিল রঁদ্যার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন । ১৮৯৮ সালের পর তাদের আর আর দেখা হয়েছে বলে এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি ।
১৮৯৯ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত কামিল পারীর কাই বোরবোঁতে নিজের স্টুডিওতে কাজ করে গেছে একটানা স্বতন্ত্র ও স্বাধীন ভাবে; কোনো কোনো সুত্র থেকে জানা যায় কামিল তাঁর শেষ ভাস্কর্য গড়েন ১৯০৫ সালে। এ সময়টিতে ও সবসময় ‍কামিলের বাবা তাঁকে সহযোগিতা করে গেছেন। অন্যদিকে কামিলের মা ও ভাই কবি পল ক্লদেল ছিলেন গোড়া ক্যাথলিক। শৈশব থেকে যদিও বা কামিলের সাথে তাঁর ভাই ও বাবার সম্পর্ক ভালো ছিলো কিন্তু পরবর্তীতে পল কামিলের সঙ্গে তেমন কোনো ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করেননি; সে তার গোঢ়া ধার্মিক মাকে সহযোগিতা করে গেছে তার নিজের প্রতিভাবান মেয়েকে নানা ধরনের মানসিক অত্যাচার অব্যাহত রাখতে, যা চুড়ান্ত রুপ ধারন করে কামিলের বাবার মৃত্যুর পরপরই। হয়তোবা সম্পত্তির লোভও ছিলো জড়িত, জড়িত ছিলো স্বার্থ। কামিলের গর্ভপাতের ঘটনাটি তাকে তার নিজ বাড়ী ও পরিবার থেকে চলে আসতে বাধ্য করা হয় । বিশেষ করে তাঁর ধর্মান্ধ মা ও ভাই, তাঁর শিল্পী পরিচয় ও রঁদ্যার সঙ্গে বিবাহ বর্হিভুত সম্পর্ককে মেনে নিতে পারেনি কোনো দিনো ও কোনো ভাবে ।

কামিলে মা, অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির একজন মানুষ। মা হিসেবে ছিলেন নির্লিপ্ত । নিজ সন্তানের প্রতি তেমন কোনো টান অনুভব করতে কোনদিনও তাকে দেখা যায়নি, কিছু কর্তব্য পালন করা ছাড়া । ভালোবাসা বা আদর যত্নের অভাব কামিল অনুভব করেছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজন্ম। মায়ের অবহেলা কামিলের ভেতর মানসিক অসুস্থ্যতার প্রথম বীজ বপন করেছিলে, কিছু উপসর্গও নজরে এসেছিল পরিচিতজনদের। এর উপরে এস ভরে করে রদ্যাঁর নিষ্ঠুরতা ও কৌশলী মনোভাব ও সর্বোপরি কামিলের প্রতিভাকে ব্যবহার করে, রঁদ্যার সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা। সব মিলিয়ে প্রতিভাবান, সৎ ও স্বাধীনচেতা মেয়ে হয়ে সমাজে মাথা উচু করে দাড়াবার কোনো সুযোগ ও সহযোগিতাই পাননি কামিল । কামিল তাঁর অসাধারন প্রতিভাকে বিকশিত করতে পারেনি র্দুভাগ্যজনক ভাবে।

যদিও কামিলের শিল্প প্রতিভার সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে গেছে এর মধ্যেই ।পারী জেনে গেছে গভীর চোখের অধিকারীনি, সুন্দরী, বুদ্ধিমতি এই মেয়েটি একদিন খ্যাতিমান ভাস্কর হবেই। ১৯০৫ সালে, এগেন ব্লট তার গ্যালারিতে আয়োজন করেন কামিলের প্রথম একক ভাস্কর্য প্রর্দশনী । কিছু উঠতি অনভিজ্ঞ শিল্পসমালোচক, কামিলকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেন, তাকে আক্রমানত্মক আর রূঢ় ভাষায়; স্পষ্টতই পারী প্রস্তুত ছিল না তখন কামিলের আবেগ মন্থিত ভাস্কর্যগুলো দেখতে; অনুভুতিহীন অবয়ব সর্বস্ব ভাস্কর্য তখন ধর্মীয় থীমকে অবলম্বন করে ছিল; প্রসঙ্গক্রমে মনে করা যেতে পারে ইমপ্রেশনিষ্টদের ঠিক এমনভাবে প্রথম দিকে হেনস্থা হতে হয়েছিল রক্ষনশীল আর খুব ধীর লয়ে নতুন পরিবর্তনকে আত্মগত করতে পারা সমালোচকদের এবং ইতিহাস বলে সময়ের কাছে এদের পরাজয় অবশ্যমম্ভাবী;

জানা যায় এরপর থেকে কামিল আর কোনো ভাস্কর্য নির্মান করেনি । কামিলের শৈল্পিক দুইহাতে আর কেউ দেখেনি তুলে নিতে হাতুড়ি বাটাল। কামিলে মানসিক সাস্থ্যর অবনতি ঘটলে দেখা গেছে, সে অভিযোগ করছে রঁদ্যা তাঁর চিন্তা ও পরিকল্পনা চুরি করেছে বলে । নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে ভালোবাসার যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে কামিল ধ্বংস করে ফেলেন তাঁর অনেক সৃষ্টি । মাত্র ৯০ টি ভাস্কর্য ও ড্রইং আজ শুধু টিকে আছে।

কামিলের বাবা জীবিত অবস্হায় কামিলকে পুর্ন সহযোগিতা করে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু পরপরই (মাত্র ৩ দিন পরে) কামিলের মা ও ভাই ষড়যন্ত্র করে তাঁকে ভিল এভরার্ড (Ville Évrard), নামে একটি মানসিক রোগীদের জন্য আসাইলামে ভর্তি করিয়ে দেন আইনের সহায়তা । ১৯১৩ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল, জীবনের শেষ তিন দশক পৃথিবীর এই অনন্য অসাধারন প্রতিভাকে ঠেলে দেয়া হয় অন্ধকার গুহায়। এক নিষ্পাপ হৃদয়কে একদিকে রদ্যাঁর ভালোবাসার মিথ্যা নাটকের আগুনে পুড়তে হয়েছে ,অন্যদিকে মা ও ভায়ের অন্ধ ধর্মান্ধতার বলি হতে হয়েছে।

এই অসাধারন শিল্পীকে জোর পুর্বক সেই মানসিক হাসপাতালে আটকে রাখা অবস্হায় , তাঁর মা কিংবা বোন, কেউই কোনো দিনও দেখা করবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি । তেমন বন্ধু বা আত্মীয় বা শিল্প সমাজকেও কাছে ঘেষতে দেয়া হয়নি তাঁর মায়ের প্রত্যক্ষ আদেশে; কথিত আছে যে , ভাস্কর রদ্যাঁ কামিলকে টাকা পাঠিয়ে সাহায্য করাতো , তাঁর মানসিক হাসপাতালে অবস্হানের সময়। যা নিতান্ত করুনা ছাড়া অন্য কিছু ভেবে নেয়া সম্ভব না কারো পক্ষে ।

এই সুদীর্ঘ ৩০ বছরের বন্দী যন্ত্রনাময় জীবনে , শুধুমাত্র ছোটো ভাই পল কয়েকবার দেখা করতে এসেছিলো কামিলের সাথে। শেষ জীবনে এসেছিলেন ব্রিটিশ ভাস্কর জেসি লিপসকম্ব (Jessie Lipscomb) , এক সময়কার ভালো সঙ্গী কামিলের; আর তেমন কাউকে কোনোদিনো দেখা করতে দেয়া হয়নি তাঁর সাথে পরিবারের পক্ষ থেকে । এমনকি , কামিলের মৃত্যুর পর , তাঁর পরিবার থেকে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি বা তাঁর শেষকৃত্যতেও কেউ যোগদান করেননি । অবহেলিত পরিত্যক্ত কামিলকে পারিবারিক কবরস্হানেও স্হান দেয়া হয়নি । অবশেষে তাকে, সমাধিস্থ করা হয় সাধারন এক সমাধি ক্ষেত্রে।

হায় নিয়তি ! পৃথিবীর অনত্যম শ্রেষ্ঠ এক ভাস্কর শুয়ে আছেন পৃথিবীর কোনো এক অজানা অন্ধকারে।

‘পারী ’ কে সবাই জানে ভালোবাসার শহর নামে । শিল্পকলার লীলাভুমি ও বটে । সেই পারীর এক অনন্য প্রতিভাবান ভাস্করের এমন করুন মৃত্যু, পারী কি পারবে কোনোদিনো ভুলে যেতে ? পারী কি পারবে কি ক্ষমা করতে ? যদিবা কেউ কোনোদিন দেখে সেইন ( Seine) নদীর তীরে বসে কোনো প্রেমিক প্রেমিকা যুগল গভীর আলিঙ্গনে চুমু খাচ্ছে; যদি সেই দৃশ্য দেখে কারো মনে পড়ে যায়, বিখ্যাত এক ভাস্করের বিখ্যাত সৃষ্টির কথা ‘দ্যা কিস ; মনে কি পড়বে না তখন , কামিলের কথা ? সেওতো একদিন কাওকে (রঁদ্যা) গভীরভাবে ভালোবেসে বঞ্চিত হয়েছিলো ।

স্রষ্টাও যে হন্তা হয়ে উঠতে পারে তার জ্বলন্ত উদহরন হলো ভাস্কর ‘রঁদ্যা’ ।
যে হাতে সে গড়েছে শিল্পকে । যে হাতে সে রক্ষা করেছে সৌন্দর্য, দিয়েছে প্রান পাথরে । সেই হাতেই সে হত্যা করেছে প্রানপ্রাচুর্যে পুর্ন এক তরুনীর স্বপ্নকে । সেই হাতে সে অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে এক শুদ্ধতম ভালোবাসাকে ; শুধুমাত্র নিজের স্বার্থ রক্ষার্থে । যে একদিন পুনুরজীবিত হয়েছিলো নিষ্পাপ এক শিল্পী স্বত্তার স্পর্শে, তাঁর সৃষ্ট ভাস্কর্যে এসেছিলো প্রনের জোয়ার, ভালোবাসার ফুল্গধারা।
নিয়তির অদ্ভুত ফেরে গত কয়েক দশকে শিল্পবোদ্ধারা অনুভব করতে পেরেছেন কামিল ক্লদেল এর অসাধারণ প্রতিভাকে, আর তাই আজ রদ্যাঁ একক ভাবে উচ্চারিত কোন নাম নয়, কামিলের সাথে তার সৃজনশীল সময়গুলোই রুপান্তরিত হয়েছে শিল্পী হিসাবে তাকে বিচার করার একটি অনস্বীকার্য একটি মানদন্ডে।

লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ যেমন বলেছিলেন; মৃত্যু আসে না বার্ধক্যে ,মৃত্যু আসে বিস্মৃতি থেকে; আর তাই যে কোনো মুল্যে, কামিল ক্লদেলের নামটিকে ভুলতে দেয়া যাবে না কোনো ভাবেই, তলিয়ে যেতে দেয়া যাবে না বিস্মৃতির অতলে। কামিল ক্লদেল হয়ে উঠুক সেই শাশ্বত সেতুর নাম যার, শুরু হবে ভালোবাসার উন্মাদনায় আর শেষ হবে শিল্পকলার উন্মাদনায়। যে সেতুতে একদিন পা বাড়িয়ে দেবে ভবিষ্যতের শিল্পী …প্রেমিকরা ।

a slightly bitchy assessment of van gogh's dr. gachet (the person, not the painting)

Reblogged from real france:

Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post
  • Click to visit the original post

This is the Dr. Gachet you're probably familiar with.   He's at the Musee d'Orsay, wearing what Van Gogh described as "the heartbroken expression of our time."

If you were really paying attention, you might have noticed Dr. Gachet hanging out in other famous museums, looking entirely different.

Dr. Paul Ferdinand Gachet was no ordinary artists' model.   Nor was he an ordinary doctor.  

Read more… 1,161 more words

জীবন, ভালোবাসা এবং মৃত্যুর দেয়াল চিত্র:

DSC_5066

দ্যা স্ক্রিম ; মুন্কের বিশেষ প্রদর্শনী, মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট , নিউ ইয়র্ক , ২০১২

ছবি : আসমা সুলতানা

পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে আমরা যা কিছু অনুভব করি, তার সব কিছুই আবার পঞ্চইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকি । যখন জীবনের কিছু ঘটনাকে আমরা প্রকাশ করতে অক্ষম হই, আশ্রয় নেই এমন এক ভাষার যা হয়তো সম্পুর্ন নিজস্ব বা ব্যাক্তিগত । কেও তুলে নেয় রঙতুলি , কেও বা কলম, কেও বা সুর। এরপরেও অনেক অব্যক্ত ভাষা ডানা মেলে দেয় আামদের অবচেতন মনের আকাশে । ভীড় করে সব স্মৃতি স্বপ্ন ও দু:স্বপ্নের শরীর নিয়ে । এমন এক দু:স্বপ্নের শিল্পরুপ এডভার্ড মুন্কের ‘দ্যা স্ক্রিম ’ নরওয়েজিান ভাষায় যাকে বলে স্ক্রিক(Skrik )।

’দ্যা স্ক্রিম’ বা ’দ্যা স্ক্রিম অব নেচার’ শিল্পর্কমটি পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ও মুল্যবান শিল্পকর্ম গুলোর মধ্যে একটি । যে কোনো শিল্পপ্রেমিকের মুল শিল্পকর্মটি দেখবার বাসনা থাকারই কথা এবং সেকারনে তাকে যদি সুদুর উত্তর ইউরোপের দেশ নরওয়ে তে পাড়ি জমাতে হয় তবুও । তেমনই একটা বাসনা মনের ভেতরে পুষে রেখেছিলাম অনেক দিন আগে থেকেই। গত নভেম্বরে যখন মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট, নিউ ইয়র্ক দেখতে যাওয়ার সুযোগ হলো , তখনও জানা ছিলো না যে সেখানে ছয় মাসের ( অক্টোবর ২০১২ – মার্চ ২০১৩ ) জন্য শিল্পী মুন্ক এর শিল্পকর্মের একটি বিশেষ প্রদর্শনী চলছে। আর আমারো সৌভাগ্য হলো গভীর বিস্ময় নিয়ে প্রিয় মুন্ক এর কাজ দেখার ।
পৃথিবীর সব বিখ্যাত সুপরিচিত পেইন্টিংগুলোকে কিন্তু বড়সড় আকারের হতে দেখা যায় না ; যেমন ভিন্চির মোনা লিসা, ভ্যান গো এর সুর্যমুখি, ঠিক তেমনি এডভার্ড মুন্কের ‘দ্যা স্ক্রিম’ ।
এসব শিল্পকর্ম আকারকে বলা যেতে পারে মধ্যম, বেশির ভাগই যে কোনো স্বাভাবিক প্রতিকৃতির পেইন্টিং এর আকারের মতো ( ২৪ বাই ৩০ ইন্চি )।

বোধ কারি স্বল্পপরিসরে আঁকা হয় বলে তারা বেশ আবেগঘন হয়, যা কিনা শিল্পকর্মটি দর্শকের মনে জায়গা করে নিতে পারে সহজে । জায়গা করে নিতে পারে দর্শকের স্মৃতিতে । হয়তো কারো আজ আর অজানা নেই যে, মুন্কের এই বিশেষ শিল্পকর্মটি কিন্তু শিল্প চৌর্যবৃত্তির সাথে জড়িত এমন কারো কাছেও বেশ লোভনীয় বস্তু বটে।

এডভার্ড মুন্ক :

শিল্পী এডভার্ড মুন্ক (Edvard Munch) এর জন্ম ১৮৬৩ সালের বারো ডিসেম্বর, নরওয়ের লোটেন এর আডাল্সব্রুক গ্রামে (Ådalsbruk in Løten ) এবং বেশ দীর্ঘ একটি জীবন শেষে তার মৃত্যু হয় ১৯৪৪ সালে,যখন তার বয়স আশি। মুন্ক মর্ডান আর্টের প্রধান শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম ও স্বতন্ত্র একজন শিল্পী । শৈশব থেকে রোগ, শোক, দু:খ, বেদনা তাকে ঠেলে দিয়েছিল সৃষ্টির জগতে। প্রিয় মাকে হারিয়েছেন মাত্র পাঁচ বছর বয়সে,এরপরে মাত্র পনেরো বছর বয়সী বড় বোনকে হারান তার তের বছর বয়সে।
তার বাবা ছিলেন গোড়া ধার্মিক । ঘরে ছিল তার বাবার কড়া অনুশাসন, ছোট বোনের মানসিক অসুস্থতা, এরপর ছোট ভাইয়ের মৃত্যু এবং অত:পর বাবার মৃত্যু, তারসাথে যুক্ত হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভৎসতা, পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসী অধিকৃত নরওয়েতেই তার শিল্পকর্মের প্রতি নাৎসিদের অবহেলা ও অত্যাচার । সব মিলিয়ে মুন্ক জীবনের সেই অন্ধকার গুহার একজন বাসিন্দা , যেখানে সুর্যের আলো এসেছে খুব ক্ষীন আর বিচ্ছিন্ন ভাবে । মুন্কের শিল্পকর্মে সেই অন্ধকারেরই দেখা মেলে সুসজ্জিত ও সুশৃঙ্খল ভাবে । মুন্কের শিল্পকলায় হতাশাই প্রধান উপাদান, সাথে মৃত্যু , ভয়, রোগ –শোক, যৌনতা, দু:খ-বেদনা, দৈহিক ও মানসিক যন্ত্রনা, একাকিত্বতা ও বিচ্ছেদ; তিনি তার অস্তিত্বের তীব্র অন্তর্দহনকে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন নজিরবীহিন নানা রুপকের অনন্যতায়।

মুন্ক অত্যন্ত সফলভাবে তার কাজে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তাঁর গভীর মনোজাগতিক দৃশ্যপটকে। দর্শকের বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না , যে শিল্পী কিভাবে জীবনটাকে কাটিয়ে গেছেন । অভিব্যাক্তিময় কাজ গুলোতে তার শৈশব অভিজ্ঞতা ও জীবনের বিভিন্ন সময়ের আর পর্যায়ের অভিজ্ঞতাগুলোই ফুটে উঠেছে । তার জীবনে খুব অল্পই ছিলো সুখময় ।
শিল্পকলায় মাথার খুলিকে সাধারনত দেখানো হয় মৃতু বা শোকের প্রতীক হিসেবে । মুন্কের কাজে তেমন কোনো প্রচলিত, বহু ব্যবহৃত সিম্বল বা প্রতীকের ব্যবহার নেই ঠিকই, তবে তার ক্যানভাসের দৃশ্যপটে কংকাল সদৃশ ফিগারগুলোই যেনো জীবন্ত শোককে প্রকাশ করছে। তাদের দেখলে মনে হয় না রক্ত মাংসের মানুষ বা মৃত কংকাল । বরং এ দুটোর মাঝামাঝি কোনো একটা প্রানী। অনেকটাই যেন এলিয়েন সদৃশ,কোটরাগত চক্ষু ও চামড়া সর্বস্ব শরীরের কারনে তাদেরকে ভীনগ্রহের বা অপার্থিব বলেই মনে হয় ।
মুন্ক এর কাজকে অভিব্যাক্তিময় ও প্রতিকী বলা যায় অনায়াসে । যদিও জার্মান বিমুর্ত-অভিব্যাক্তিবাদের ঘরানার মধ্যে পড়ে তাঁর কাজ । তবে তাঁর কাজকে পুরোপুারি বিমুর্ত অভিব্যাক্তিবাদ বলা যাবে না । ফিগারেটিভ সেমি-এবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম বা আধা-বিমুর্ত -অভিব্যাক্তিবাদ বলা যেত পারে । তাতে মনোজাগতিক অভিব্যাক্তি এক নতুন আর অনন্য মাত্রা যোগ করেছে । যদিও মুন্কের কাজ কে প্রভাবিত করেছে , ফরাসী ইম্প্রেশনিস্টরা ও, শিল্পী পল গঁগ্যা ও ভিনসেন্ট ভ্যান গো তাদের মধ্যে অন্যতম ।
নিজের কাজ সম্পর্কে মুঙ্কের নিজের ভাষ্য বলছে.. “ শিল্পী লিওনার্দো দা ভিন্চি, যেমন মানব মৃতদেহকে পরীক্ষা নীরিক্ষা করেছেন ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে আর আমি ব্যাবচ্ছেদ করেছি মানুষে মন কে , তার গভীরের অন্তর্গত স্বত্তাকে ।”

দ্যা স্ক্রিম :

লেখার শুরুতে মুন্কের যে শিল্পকর্মটির কথা উল্লেখ করেছি সেটি মুন্ক এর আঁকা প্রধান চারটি ভার্সনের একটি , যা ১৮৮৫ সালে প্যাস্টেলে আঁকা হয়। ২০১২ সালের মে মাসে বিখ্যাত অকশন হাউজ সথবে আয়োজিত ইম্প্রেশন্স্টি এবং মর্ডান আর্টের নীলামে -বিক্রি করা হয় প্রায় ১২০ মিলিয়ন ডলারে । দ্যা স্ক্রিম শিল্পকর্মটি পৃথিবীর শিল্পকলার ইতিহাসে আইকনিক শিল্পকর্মগুলোর অন্যতম একটি । মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট নিউ ইয়র্ক , ছয় মাসব্যাপী যে প্রদর্শনীটির আয়োজন করেছে সেখানে প্যাস্টেলে আঁকা এই ভার্সনটি সহ আরো রয়েছে একটা লিথোগ্রাফ ভার্সন ।
দ্যা স্ক্রিম – এর মুল চারটি ভার্সন এঁকেছিলেন মুঙ্ক। এর মধ্যে প্রধানটি ছিল তেল রঙে আঁকা । টেম্পেরাতে আঁকা র্ভাসনটি রয়েছে মুন্ক মিউজিয়াম (১৯১০) এ । আরো একটি ১৮৯৩ সালের আঁকা, রয়েছে মুন্ক মিউজিয়ামে । প্যাস্টেলে আঁকা (১৮৮৩) আরেকটি রয়েছে ন্যাশনাল গ্যালারী অব অসলো, নরওয়েতে। ১৮৯৫ সালে মুন্ক তাঁর প্রিয় মাস্টারপিসটির একটি গ্রাফিক ভার্সন সৃষ্টি করেন ।
মুন্কের লেখায় বা কবিতায় মুন্ক দ্যা স্ক্রিম – সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন এভাবে:
“আমি (ব্রীজের উপর দিয়ে )হেটে যাচ্ছিলাম (দুই বন্ধু সহ ), সুর্য অস্ত যাচ্ছিলো , হঠাৎ মনে হলো আকাশটা রক্ত লাল হয়ে গেলো । আমি দাড়িয়ে গেলাম, ভয়ে বা অসুস্হতায় । মনে হলো আমার শরীর কাঁপছে , মনে হলো এক দীর্ঘ বিকট চিৎকারে ভেসে যাচ্ছে চারিদিক , সেই চিৎকারে বিছিদ্র হলো প্রকৃতি।”

দ্যা স্ক্রিম এর মুল ফিগারটিকে পার্থিব বলে মনে হয় না । প্রায় কংকাল সদৃশ্য ফিগারটিতে কিছু সহজ রেখার মাধ্যমে এর দুবর্লতাকে বা শক্তিহীনতাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দুরের ফিগার দুটোকে মুল ফিগারটির চেয়ে মনে হয় বেশী বাস্তব ও সাবলীল, এগুলো মুন্কের বন্ধুদের অবয়ব হতে পারে । এ ফিগারগুলো থেকে প্রধান ফিগারটির দুরত্ব, বর্ননা করে মুন্কের একাকিত্বতা বা বিচ্ছিন্নতাকে । এখানে দেখা যায়, প্রকৃতির এই অস্বাভাকিতায়, সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেটে যাওয়া ফিগারগুলোতে, যেনো কোনো বিকার নেই । বিকট চিৎকার সামনের ফিগারটিকে যেভাবে প্রবাবিত করছে,তাদেরকে সেভাবে প্রভাবিত করছে না।

দ্যা স্ক্রিম এর এই অভিজ্ঞতাটি তাঁর হয়েছিল নরওয়ের অসলো শহরে দক্ষিন পুর্বে অবস্থিত ইকেবার্গ ( Ekeberg) পাহাড়ের উপরের একটি রাস্তায়, স্থানীয়দের কাছে যা পরিচিত Valhallveien নামে; এর উপর থেকেই পুরো অসলো শহরটাকে এক ঝলকে দেখা যায়; পাহাড়ের উপর দিয়ে রেলিং সহ আকাবাকা হয়ে উঠে যাওয়া এই রাস্তাটি অসলো (মুঙ্কের সেই সময় অসলোর নাম ছিল ক্রিষ্টিয়ানা, পরে যা পরিবর্তন করা হয়) বাসীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় । মুন্ক তাঁর আর সব কাজের মতো দ্যা স্ক্রিম এও নিজের মনোজগতিক ও শারীরিক গভীরতম অনুভুতিকে প্রকাশ করেছেন । আাকাশের লাল গোলাপী হলদেটে রঙে পরাবাস্তবতার আভাস। দুরে নীচে নদীর মতো বাকানো গভীর গাঢ় নীলচে কালো — লাল-বাদামী-নীল -সবুজাভ মিশ্র রঙের বিমুর্ত প্রকৃতি বা ভুদৃশ্য । চেনার উপায় নেই এটি মুন্কের চির চেনা সেই রেলিং দিয়ে ঘেরা পথ, যেখান থেকে পুরো শহরটাকে দেখা যায়। এই ইকেবার্গ পাহাড়ের আশেপাশের প্রকৃতির সাথে জড়িয়ে আছে মুন্কের অনেক স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা ।

উপরে ব্রীজে তিনটি মানব মুর্তি , নীচে বিমুর্ত প্রকৃতি । মনে হয় চির চেনা জগৎ যেভাবে বিমুর্তভাবে দেখা দেয় স্বপ্নের ভেতর। গভীর ঘুমে দু:স্বপ্নের ভেতর যেমন চিৎকার করলে যেমন কেউ শুনতে পায়না , হৃদয় চিরে বের হয়ে আসা চিৎকারকে শরীরের ভিতরেই শুষে নিতে হয়। চিত্রে প্রধান ফিগারটিকে ঘিরে যেনো প্রকৃতির চিৎকার চারিদিকে । ফিগারটি চিৎকার করাবার চেষ্টা করছে কিন্তু কেউ তা শুনতে পারছে না । ঠিক তেমন এক অনুভুতিকে প্রকাশ করছেন মুন্ক তার এই শিল্পকর্মটিতে ।
মুন্কের প্রকাশভঙ্গি তাঁর শিল্পকর্মের মতোই আজো অনবদ্য ; “শিল্পকলা , সাহিত্য, সংগীতের সবকিছুই অবশ্যই শিল্পীর হৃদয় নিসৃত রক্ত থেকে সৃষ্টি হতে হবে । শিল্পকলা হলো শিল্পীর নিজের হৃদয়েরই রক্ত ক্ষরণ।”

Paintings from the darker side of life - Ajax and Cassandra

Reblogged from a point of no return:

Click to visit the original post

Ajax and Cassandra, by Solomon Joseph Solomon. Image taken from wikipedia

I have always had a soft spot for the Pre – Raphaelite Brotherhood; a group of English painters from the 19th century that combined a realistic representations of nature with an extensive use of symbols. The painting above is my favorite one by Solomon Joseph Solomon (1860-1927), a portrayal of the famous rape of Cassandra by the Greek hero Ajax the lesser.

Read more… 305 more words