ভালোবেসে দেখিয়াছি. . .

দুচোখে উপচে পড়া ভালোবাসা নিয়ে শিল্পী কে সেজ,

আমেরিকান পরাবাস্তববাদী শিল্পী এবং কবি ক্যাথরিন লিন সেজ(২৫ জুন ১৮৯৮ – ৮ জানুয়ারী১৯৬৩) যিনি কে সেজ (Kay Sage) নামেই পরিচিত ছিলেন। ভালোবাসা কত গভীর হতে পারে তিনি তা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এই মহীয়সী নারী, এই অসাধারণ প্রেমিকা শিল্প চর্চা করবার জন্য প্রথম স্বামী, এক রাজপুত্রকে , জাগতিক   সুখ,  সম্পদ  ত্যাগ করে রোমে চলে ‍আসেন। পরবর্তীতে প্যারিসে এসে পরাবাস্তববাদী শিল্পীদের সাথে যোগ দেন , এদের মধ্যে ছিলেন স্প্যানিশ শিল্পী সালভাদর দালি, গ্রীক শিল্পী ডি কিরিকো ও ফ্রেন্জ শিল্পী ইভ টঙ্গি।

শিল্পী কে সেজ ও তাঁর ভালোবাসা ইভ টঙ্গি, ১৯৫০

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইভ টঙ্গিকে নিয়ে কে সেজ ফিরে ‍ আসেন আমেরিকায়। তারপর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং বাকীটা জীবন এক সাথে কাটান। কানেকটিকাটে একটি খামারবাড়িতে যেখানে এই শিল্পী দম্পতি নতুন করে তাদের স্টুডিও সাজান। ১৯৫৫ সালে ইভ এর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এখানেই কাটান কে। ‍প্রিয় ইভ এর মৃত্যু তাকে দারুন কষ্ট দেয়। দিনে দিনে সেজ ভেঙ্গে পড়েন দেহে-মনে। তিনি আর আ‍কাতে কিছুতেই মন বসাতে পারছিলেন না, কবিতার শব্দেও ছিল হতাশা আর বিষাদ। একেবারে সন্ন্যাস জীবন বেছে নেন শেষ পর্যন্ত । যেটুকু শক্তি ছিল তা ব্যয় করে প্রিয় টঙ্গির শিল্পকর্মে , সমালোচকদের সমালোচনার জবাব দিতে।

১৯৫৬ সালে , শিল্পী কে সেজের আঁকা, লা পেসেজ

….এ সময় ধীরে ধীরে দৃষ্টি শক্তিও হারান তিনি। তাঁর এই বিষন্নতা, ক্ষীন দৃষ্টি নিয়ে তারপরও তিনি আরো কিছু অসাধারন শিল্প কর্ম সৃষ্টি করেন। ১৯৬১ সালে তার সেই সমস্ত শিল্পকর্ম, কবিতা নিয়ে নিউইর্য়কে অনুষ্ঠিত হয় ’ইয়োর মুভ’ নামে কে সেজ এর শেষ প্রদশনীটি ।

ক্যানভাস ছাড়াও সেখানে ছিল স্থাপনা শিল্প নিয়ে কিছু কাজ, যা ছিলো ত্রিমাত্রিক ও একেবারে অনন্য আর ভিন্নধর্মী। প্রিয় ইভকে হারানো বিষন্নতা আর হতাশা থেকে তিনি আর বের হতে পারেননি। ১৯৫৯ সালে প্রথমবার আত্মহননের চেষ্ঠা করে ব্যার্থ হবার পরে, ১৯৬৩ সালে ইভ এর জন্মদিনের তিন দিন পরে ৮ জানুয়ারীতে আত্মহত্যার দ্বিতীয় বার প্রচেষ্টায় সফল হন সেজ।

৬৪ বছর বয়সে এই সৎ ও মহান, প্রেমিকা তথা শিল্পী  কে সেজ ও ইচ্ছা মৃত্যর দরজা পার করে ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পন করেন। ঠিক যেমনটি করেছিলেন বছর তিরিশেক আগে শিল্পের কাছে, তথাকথিত সুখ ও সমাজ ত্যাগ করে …  কে মনে রেখেছে?

এখানেই শুয়ে আছে শিল্পী মদিগ্লিয়ানি ও তাঁর ভালোবাসা জীন

এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আরেক সত্য ও গভীর ভালোবাসার গল্প, সেজের সমসাময়িক শিল্পী মডিগ্লিয়ানি’র (১২ জুলাই, ১৮৮৪-২৪ জানুয়ারী, ১৯২০) মৃত্যুর পরে, যেমন তাঁর  অন্তস্বত্তা স্ত্রীও  স্বেচ্ছায় স্বামীর সাথে সহমরণে সহযাত্রী হয়েছিলেন। প্রিয় স্বামী ও ভালোবাসা  শিল্পী  মডিগ্লিয়ানি’র মৃত্যুর  খবর পেয়ে, প্রায় নয় মাসের গর্ভের শিশু সহ  স্ত্রী ও সহ শিল্পী জীন পাঁচ তলার জানালা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহনন করেন। ভালোবাসার এই সব আত্মত্যাগ পৃথিবী কি মনে রেখেছে?

অদ্ভুত, অপূর্ব এই ভালোবাসা শুধু ভালোবাসা দিয়েই অন‍ভব সম্ভব !  প্রেমিকা  ও  শিল্পী, অপূর্ব এক সমন্বয়ে যিনি পরাবাস্তব জগতের প্রসূত ভ্রুন;  শিল্পী কে সেজকে  শ্রদ্ধা !

১৯৪২ সালে আঁকা, শিল্পী কে সেজের এই দ্যা ফোর্টিন ড্যাগারস চিত্রটি দেখলে, মনে হবেই পরাবাস্তববাদী শিল্পী রেনে ম্যাগ্রিটের কথা

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s