Ways of Seeing

‘Boi Mela’, the word stands for ‘book fair’ in Bengali (Bangla), our mother tongue. It is more correctly known as ‘Ekushey Book Fair’ or ‘Amar Ekushe Grantha Melā’ (Bengali: অমর একুশে গ্রন্থ মেলা [ɔmɔr ekuʃe grɔnt̪ʰɔ mæla] Lit. “Book Fair of immortals of the 21st [of February]”). It is the national book fair of Bangladesh which is arranged each year by the Bangla Academy and take place for whole month of February in Dhaka. The book fair is dedicated to the ultimate sacrifices made by the Bangladeshi people on 21 February 1952 in a demonstration calling for the establishment of Bengali as one of the state languages of former united Pakistan. Bangladesh later emerge as an independent nation in 1971. The day 21 February is officially known as ভাষা আন্দোলন দিবস (Bhasha Andolôn Dibôs) (also শহীদ দিবস (Shôhid Dibôs)). And from 17 November 1999, UNESCO declared the day as International Mother Language Day to promote awareness of linguistic and cultural diversity and multilingualism.

This year Boi Mela has a different dimension for me. I am happy to announce the publication of my first book. It is a Bengali translation of very important art criticism book by John Berger, Ways of Seeing. I obtained the permission from original author to publish this book. It is published by Onarjo Publications, soon to be available in their stall no 297-298. I hope this book will made a contribution to our art criticism education in Bangla as well as meet the need of curious readers who wants know how art could impact every facet of our livesWOS_book_2015_for_blog

এবারের বইমেলায় দুটি বই…

জীবনের বিজ্ঞান

এবারের বই মেলায় দুটি বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, প্রকাশ করছে অনার্য প্রকাশনী, এটাই বই প্রকাশনার জগতে আমার এবং আসমা সুলতানার প্রথম প্রবেশ..

প্রথম বইটি ওয়েজ অব সিইং , সত্তরের দশকে এটি লিখেছিলেন বৃটিশ শিল্প সমালোচক জন বার্জার, একই নামে তাঁর একটি যুগান্তকারী টিভি প্রামাণ্য অনুষ্ঠানের. ভিত্তি করে। এটি শিল্পী আসমা সুলতানা এবং আমার যৌথ অনুবাদ প্রচেষ্টা। শিল্পী রেনে ম্যাগরিট এর তৈলচিত্র দি হিউমান কন্ডিশন এর ভিত্তি করে বইটির প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করেছেন শিল্পী আসমা সুলতানা। শিল্পকলার অনুরাগী এবং  দৈনন্দিন জীবনে শিল্পকলার প্রভাব কত সর্বব্যাপী হতে পারে, সেটি যারা জানতে আগ্রহী তাদেরকে এই বইটি হতাশ করবে না ।

WOS_book_2015_for_blog

দ্বিতীয় বইটি দি গড ডিল্যুশন, ২০০৬ সালে প্রকাশিত বিবর্তন জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স এর এই বইটির বেশ কয়েকটি অধ্যায় আমি ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করেছিলাম এই ব্লগের জন্য, অনেকেই একারণে এই ব্লগটিতে এসেছেন, অবশেষে এবারের বইমেলায় এটি বই হিসাবে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। এটিরও প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করেছেন আসমা সুলতানা তার নিজের একটি চিত্রকর্ম ‘মিরর’ ব্যবহার…

View original post 18 more words

দি হিরো অ্যাস আর্টিস্ট: বীরের ভূমিকায় শিল্পী

10690215_10204643669305146_2323702193695636962_n

If you wish to understand others you must intensify your own individualism. -The Critic as Artist, Oscar Wilde

 

শিল্পকলায় দুর্ভিক্ষ এবং জয়নুল আবেদিনের ক্ষুধার্ত তুলি:

বাংলাদেশের সবচেয়ে সন্মানিত শিল্পী হিসাবে জয়নুল আবেদিনের (১৯১৪-১৯৭৬) অবস্থান বিতর্কের উর্ধ্বে। বড় মাপের কোনো শিল্পীকে সাধারণত মূল্যায়ন করা হয় একাধিক স্তরে – সমাজ, সহকর্মী, চেতনার উত্তরসূরি, সমালোচক ইতিহাসবিদদের দ্বারা। আমাদের ভৌগলিক সীমানায় এই প্রত্যেকটি স্তরে তাঁর অবস্থান সুনিশ্চিৎ হওয়া সত্ত্বেও আমরা ব্যর্থ হয়েছি তাঁর প্রকৃত অবস্থানটিকে যৌক্তিক পর্যালোচনা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করতে, আর সেই শূন্যস্থানটি প্রায়শই সুযোগ করে দিয়েছে কিছু ভিত্তিহীন সমালোচনার।

উপমহাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসবিদরা জয়নুল আবেদিনকে উপমহাদেশের শিল্পকলায় আধুনিক শিল্পীদের প্রথম সারিতে রেখেই মূল্যায়ন করেছেন ঠিকই, কিন্তু আমরা তাঁর স্বদেশীরা ব্যর্থ হয়েছি জয়নুল আবেদিনের তুলি থেকেই উপমহাদেশে আধুনিক শিল্পকলা বৈপ্লবিক সূচনা হয়েছিল সেই বাস্তব সত্যটিকে প্রতিষ্ঠা করতে, আর এই প্রবন্ধের মূল প্রস্তাবনা সেটাই। আমরা জয়নুল আবেদিনকে অখণ্ড ভারতের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে তাঁর যোগ্য অবস্থানটি এখনও দিতে পারিনি। নেতিবাচক না হয়েও এর কারণ হিসাবে চিহ্নিত করতে পারি, শিল্পকলার ইতিহাসের বৈশ্বিক পটভূমি সম্বন্ধে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, যোগ্যতা সংক্রান্ত সংশয় থেকে সৃষ্ট আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পকলার ইতিহাস চর্চার অনীহা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে সুপরিকল্পিত উপায়ে সত্যকে প্রকাশিত না হতে দেবার প্রচেষ্টা।

সবার আগে আমাদের মনে রাখতে হবে শিল্পী হিসাবে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল কিশোরগঞ্জের ব্রহ্মপূত্র নদের পাড়ে। তিনি এই উপমহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক নানা পট পরিবর্তনের স্বাক্ষী, যে ঘটনাগুলো তাঁর শিল্পী মানসতো বটেই আমাদের আর্থ সামাজিক আর সাংস্কৃতিক পরিচয়ে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। একজন শ্রেণী, সমাজ ও রাজনীতি সচেতন শিল্পী হিসাবে তিনি বাস্তবতার এই স্বরুপটিকে তাঁর শিল্পী মানসে আত্মীকৃত করে নিতে পেরেছিলেন। আর সেকারণেই আমরা তাঁকে সেই সাহসী বীরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখি কলকাতার রাস্তায়, যেখানে মানব অস্তিত্বে তীব্র টানাপোড়েন তাঁর মেধা, দক্ষতা আর মননকে অনায়াসে সমন্বয় করেছিল বাস্ববতা আর মানবিক ট্রাজেডিকে একটি নতুন রুপ দেবার জন্য। উপমহাদেশে যে কাজটি আর কোনো শিল্পী এর আগে করতে পারেননি।

পঞ্চাশের মন্বন্তরের মানবিক দূর্দশা যেভাবে রেখাচিত্রে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল তাঁর সৃজনশীলতার স্বতঃস্ফুর্ত প্রকাশে তা অভূতপূর্ব। কোনো শিল্পীই এই ভূখণ্ডে তাঁর আগে এভাবে নির্মোহ অথচ তীব্রতম প্রতিবাদের মহাকাব্য রচনা করতে পারেননি, যা আমাদের সম্মিলিত অবচেতনে অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছে। আর সেটাই শিল্পকলার আধূনিকতার একটি বিস্ফোরণ ছিল শিল্পকলায়। তিনি শুধু সেখানে স্ফুলিঙ্গ নন, আগুনের লেলিহান শিখাও, যে শিখার আলোয় আমরা এখনও আমাদের উপেক্ষিত শিল্পকলার স্বরুপ সন্ধানে উদ্যোগী হতে পারি।

30DMC_ZAINUL_1_2083887g

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ছিলেন তাঁর সমসাময়িক সময়ের উপমহাদেশীয় শিল্পকলার জগতে প্রথম আধুনিক চিত্রশিল্পী যিনি এই উপমহাদেশের মাটিতেই জন্মগ্রহন করেছিলেন এবং  শিল্পকলা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন, এবং আজীবন এই উপমহাদেশের সীমানার মধ্যেই শিল্পচর্চা করেছিলেন। তাঁর কাজের প্রধান বিষয়বস্তু ছিলো বাংলার আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে, মানুষের জীবন ও অস্তিত্বের সংগ্রাম। এবং  তাঁর পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে তাঁর পারস্পারিক সম্পর্কের প্রতিক্রিয়াগুলোরই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। তিনি তাঁর অন্তর্গত অনুভূতিগুলোকে অভিব্যক্ত করেছেন অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে এবং আধুনিক ভঙ্গিমায়। কোনো কাব্যময় ভাবপ্রবণতাকে তিনি তাঁর কাজে স্থান দিতে চাননি। তাঁর শিল্পকর্মের উপস্থাপনা ছিলো অত্যন্ত বাস্তব ঘনিষ্ঠ, রাজনীতি ও সমাজ সচেতন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন তাঁর কাজের মাধ্যমে এই উপমহাদেশে আধুনিক শিল্পকলার বীজ বপন করে দিয়ে  গিয়েছিলেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। উপমহাদেশের শিল্পকলার জগতে যে দুর্ভিক্ষ বিরাজমান ছিলো, সেখানে জয়নুল অবেদিনের  ক্ষুধার্ত তুলি সর্বদাই খুঁজে ফিরেছে মুক্তির নিঃশ্বাস।

শিল্পীর সংজ্ঞা:
শিল্পী জয়নুল আবেদিনের শিল্পর্চচাকে বিশ্লেষণ করবার পূর্বে কিছু সংজ্ঞা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা হওয়া প্রয়োজন। শুরু করা যাক খুব সরল একটি প্রশ্ন দিয়ে; একজন শিল্পী বলতে আমরা কি বুঝি?  সম্প্রতি ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটিশ ভাস্কর ও স্হাপনা শিল্পী আনিশ কাপুর (জন্ম ১৯৫৪) এনডি টেলিভিশনের এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি একজন ‘শিল্পী’ হতে চেয়েছিলেন এবং তিনি কেবল সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। তিনি কখনই ভারতীয় শিল্পকলার চর্চা করতে ইচ্ছুক ছিলেন না, তাই ‘ভারতীয় শিল্পী’ হতে চাননি। আনিশ কাপুর মূলত ‘ভারতীয় শিল্পী’ এবং ‘শিল্পী’ বলতে কি বোঝাতে চেয়েছিলেন? যে শিল্পকলা মূলত শুধুমাত্র ভারতীয় ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে, তাকে ভারতীয় শিল্পকলা যেমন বলা যায় তেমনভাবে, ভারতীয় শিল্পী বা ঐতিহ্যবাহী শিল্পী বলতে বোঝায়, যে শিল্পীরা ভারতীয় ঐতিহ্য সংশ্লিষ্ট শিল্পচর্চা করে থাকেন তাদেরকে ( যাদের শিল্পচর্চার মূল অনুপ্রেরণা ভারতীয় সংস্কৃতি)। যদি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে দাড়িয়ে একজন দর্শক, এই শিল্পকলা দেখলে ভারতীয় বলে শনাক্ত করতে পারেন, তবে তাকেই আমরা ভারতীয় শিল্পকলা বলতে পারি। অন্যদিকে ‘শিল্পী’ বলতে আনিশ কাপুর বুঝিয়েছেন  সমসাময়িক শিল্পী আথবা  আধুনিক বা উত্তর আধুনিক যুগের শিল্পী  বা স্টুডিও শিল্পী। যিনি নিজের চিন্তাধারাকে ভিত্তি করে স্বাধীন ভাবে শিল্পচর্চা, সৃজনশীলতার চর্চা এবং নান্দনিকতার চর্চা করে থাকেন এবং  যিনি তার সৃষ্ট শিল্পকর্মের মাধ্যমে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ভাবে নিজের মনোভাবকে অভিব্যক্ত করতে পারেন। যেহেতু আনিশ কাপুর এ যুগের শিল্পী আমরা ধরে নিচ্ছে তিনি উত্তর আধুনিক সময়ের শিল্পী এবং তাঁর কাজকে আমরা আধুনিক বা সমসাময়িক বলতে পারি।

শিল্পকলায় আধুনিকতা:
শিল্পকলায় আধুনিকতা বলতে সাধারণ ভাবে ধরে নেয়া হয় শিল্প বিপ্লব এবং তৎপরবর্তী সময়ে শিল্পকলাতে যে নতুন পরিবর্তন আসে, মূলত সেই নতুন ধারাটিকে। আধুনিক শিল্পকলার ব্যাপ্তি ধরা হয় ১৮৬০ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সময়কালকে । শিল্পীরা পুরাতন ভাবধারাকে বাতিল করে দিয়ে, নতুন কৌশলে, নতুন শৈলীতে শিল্পচর্চা শুরু করেন। শিল্পের বিষয়বস্তু, কৌশল, আকার এবং উপাদান নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করেন।  শিল্পকলার আধুনিক যুগের সাথে আধুনিক সময়ের আর্থসামাজিক এবং সংস্কৃতি এবং আরো অনেক আনুসাঙ্গিক বিষয় জড়িত। ক্যামেরা আবিষ্কারের ফলে আলোকচিত্রও বদলে দেয় শিল্পকলা সর্ম্পকে মানুষের গতানুগতিক ধারণা। শিল্পীর স্বতন্ত্রতা এখানে মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। আধুনিক সময়ে এক একজন শিল্পী স্বতন্ত্র ভাবে এক একটি মতবাদ গড়ে তুলতে সক্ষম এবং  মনে রাখতে হবে যে আধুনিক শিল্পকলা উপলব্ধির বিষয়, এটি পূর্বের মতো বর্ণনা মূলক নয় বা ইতিহাস ব্যাখ্যাকারী কোনো মাধ্যম নয়। আধুনিক শিল্পকলার শুরুতে দার্শনিক নীচাহ এর প্রভাব অনস্বীকার্য। একজন শিল্পীকে আধুনিক হতে হলে তাকে মুক্তচিন্তার ও মুক্তবোধের হতে হবে। যাতে করে সে কোনো কিছু নতুনকে যেমন আমন্ত্রণ জানাতে পারেন,  তেমনি প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় পুরাতন কোনো কিছুকে বর্জন করতেও কুন্ঠা বোধ করবেন না।

P19=====02

Art is not merely an imitation of the reality of nature, but in truth a metaphysical supplement to the reality of nature, placed alongside thereof for its conquest. -Friedrich Nietzsche

 

উপমহাদেশের শিল্পকলায় আধুনিকতা:
উপমহাদেশের আধুনিক শিল্পকলার সংজ্ঞা এবং শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে বেশ কয়েকজন শিল্প সমালোচক এবং শিল্পকলার ইতিহাসবিদ গবেষণা করেছেন। তবে বিষয়টি নানা ভাবে অসমাধান অবস্থায় রয়ে গেছে বলে আমার ধারণা।  শিল্পকলার ইতিহাস কোনো বিজ্ঞান নয় যে যুক্তি, তথ্য প্রমাণ দিয়ে সবাই প্রমাণ করে দেবেন। যদিও শিল্পকলার ক্ষেত্রেও চাক্ষুষ প্রমাণ এবং তথ্যের কোনো বিক্ল্প নেই, তবুও শিল্পকলায় স্বতন্ত্রের নান্দনিক ব্যাখ্যার উপরে অনেক কিছু নির্ভর করে। তবে সেটা যত বাস্তবধর্মী হয় ততই মঙ্গল। যদিও এশীয় বা উপমহাদেশীয় অঞ্চলে ভাবাদর্শের প্রতি মানুষের বিশেষ দূর্বলতা রয়েছে।  আধ্যাত্মিকতা এবং মৃত্যুর  পরের জীবনকে প্রাধান্য দেবার কারণে তারা প্রায়শই যুক্তি প্রমাণ এবং বাস্তব ব্যাখ্যা না খুঁজে, কাল্পনিক অলীক অনেক  ব্যাখ্যাতেই তুষ্ট থাকেন।

আমার মতে অনেক সময়, এখানে শিল্পকলার ক্ষেত্রে সময়ের ধারাবাহিকতাকেই আধুনিক বলে ধরা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে আধুনিক সময়ে জন্ম গ্রহনকারী শিল্পীদেরকেই আধুনিক বলা হয়ে থাকে সাধারণত। তাদের শিল্পকর্মে কতটুকু সেই আধুনিকতা ফুটে উঠেছে সেটা যাচাই বাছাই এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করেই। কিছু কিছু মানুষ এর ব্যতিক্রমে অবস্থান করেছেন এবং আজো করছেন। এবং তারা কারা? সেই আলোচনাও এখানে প্রাসঙ্গিক। যেমন কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর, শিল্পী অমৃতা শের – গিল, শিল্পচার্য জয়নুল আবেদিন প্রমূখ। যদিও উপমহাদেশের শিল্পকলার চর্চার ধারাবহিক কোনো ইতিহাস নেই তবুও আমরা ইতিহাস চর্চা করে যে সব তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারি, তার উপরেই ভিত্তি করে আমরা আমাদের গবেষণার বিষয়াদিকে সাজাতে পারি।

আধুনিকতা সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত মতামত:
আমার কাছে আধুনিকতার সংজ্ঞা শুধু মাত্র সময়ের কোনো ধারাবাহিক চলমানতা নয়; আধুনিকতা অর্থটি এর থেকেও ব্যাপক। সময়ের খাঁচায় বন্দি থাকবার নাম আধুনিকতা নয়। আধুনিকতা হলো সময়কে মুক্ত করে দেবার একটি প্রক্রিয়া। একজন ব্যক্তি, তার কাজের মাধ্যমে নিজের স্বতন্ত্রতাকে প্রকাশ করা। কোনো নিদির্ষ্ট জাতি বা ধর্ম বা সংস্কৃতির পরিচয় বহনের নাম আধুনিকতা নয়। মানব জাতির প্রতিনিধি হিসেবে একজন মানুষের তার চিন্তাধারা বা কাজের মাধ্যমে স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠার নামই আধুনিকতা। যার মাধ্যমে তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক রুচির প্রকাশ ঘটবে এবং অন্যরা সেটাকে নিজের বোধের মাধ্যমে উপলব্ধি করবে।

12460031_10154781344953521_730358715_n

উপমহাদেশে আধুনিকতার হাওয়া:
বিংশ শতাব্দীর শুরু দিকেও ভারতে শিল্প বিপ্লবের হাওয়া লাগেনি, সামাজিক শ্রেণী বৈষম্যগুলো তখনও ভেঙ্গে পড়েনি। উপমাহদেশের শিল্পীরা তখন ঔপনিবেশিকতার শিকল থেকে বের হয়ে দেশাত্ববোধে, জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন ভাবে নিজেদের আত্মপরিচয়কে তুলে ধরবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তাদের কাজের মাধ্যমে। রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ব্রিটিশ শিল্পকলার গুরু ই. বি. হাভেলের সহোযোগিতায় উপমহাদেশের শিল্পীরা ধীরে ধীরে পরিচিত হচ্ছিলো পশ্চিমা রীতির সাথে। ১৯২২ সালে জার্মানের বাউহাউজের আধুনিক শিল্পীদের শিল্পকর্মের এক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় কলকাতায়। যেখানে শিল্পী পল ক্লি, ভাসিলি কান্দিনস্কি,   ইয়োহানেস ইত্তেন প্রমুখ শিল্পীদের শিল্পকর্ম স্থান পায়। উপমহাদেশীয় শিল্পীরা সেই প্রদর্শনী দেখে পশ্চিমা আধুনিক শিল্পকলা সম্পর্কে ধারণা পান। তাদের প্রতিক্রিয়া যদিও বেশ ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে। এবং তাদের সবার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটে। ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়।  শিল্পীরা ঔপনিবেশিকতার কুফল এবং জাতিয়তাবোধের সুফল বুঝতে ব্যার্থ হন নানা কারণে। তাদের শিল্পসৃষ্টি মধ্যে সেই টানাপোড়োনের গ্লানি ধীরে ধীরে ফুটে উঠতে থাকে, নিতান্ত অনিচ্ছা স্বত্তেও।

বেঙ্গল স্কুল:
ঔপনিবেশিক শাসনামলে উপমহাদেশের শিল্পীরা যখন পশ্চিমারীতির শিল্পকলা অনুকরণে শিল্পচর্চা করতে অস্বিকৃতি জানান তখন তারা পুরাতন শৈলীর বা অতীতের ঐতিহ্যেকে ফিরিয়ে আনতে স্বচেষ্ট হয়েছেন তাদের শিল্পকলার মাধ্যমে। উপমহাদেশের মুঘল মিনিয়েচার, রাজপুত মিনিয়েচার, পারস্য রীতির মিনিয়েচার, অজন্তা ইলোরার  চিত্ররীতি, উপমহাদেশের লোকজ শিল্পকলা বিভিন্ন উৎসকে তারা তাদের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু করে নিলেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ফলে, কোম্পানি রীতি ও অ্যাকাডেমিক বাস্তাবতাকে তারা বাতিল করে দিয়ে, তাদের হারিয়ে ফেলা ঐতিহ্যকে আবার ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেন  বেঙ্গল স্কুল অব আর্ট। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্রিটিশ শিল্পকলার শিক্ষক  ই. বি. হাভেল (১৮৬১-১৯৩৪) রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহোযোগিতায়, উপমহাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের জন্য শিল্পীদের অনুপ্রেরণা দেন, সেই বিশেষ শিল্পরীতিকে বলা হয় বেঙ্গল স্কুল । তারা অতীতের শৈলীকে অনুকরণ করেন স্বদেশী চেতনায়, জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত হয়ে  শিল্পকলা চর্চার প্রচেষ্টা করেন। শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১-১৯৫১), নন্দলাল বসু (১৮৮২-১৯৬৬) সুনয়না দেবী (১৮৭৫-১৯৬২), যামিনী রায় (১৮৮৭-১৯৭২), গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬৭-১৯৩৮) প্রমুখ বেঙ্গল স্কুলের রীতিতে শিল্পচর্চা করেন । যদিও হাভেল মহতি উদ্যোগ সমাধানের পথ না দিয়ে সমস্যাটাকে বেশ ঘণীভূত করে দিতে থাকে। কারণ হাভেল বোঝতে মূলত ব্যর্থ হন উপমহাদেশের শিল্পীরা, পশ্চিমের শিল্পরীতি অনুকরণ না করেও নিজস্ব ভঙ্গিমায় শিল্পকলার চর্চা করতে পারতেন। হাভেলের ব্যর্থতার কারণ উভয় পক্ষের দূরদৃষ্টিতার অভাব এবং তৎকালীন আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিল্পকলার ভূমিকা সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টির ঘাটতি। বিশ্বের শিল্পকলার জগতে  ইংল্যান্ডের শিল্পকলা তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। শুধুমাত্র রোমান্টিকতা, শিল্পী কন্সটেবল এবং শিল্পী টার্নারের (১৭৭৫-১৮৫১) নিরীক্ষাধর্মী নিসর্গচিত্র এবং তার পূর্বে প্রি-র‌্যাফালাইট (১৮৪৮) ঘরানার আর্বিভাব, পরবর্তীতে ভর্টিসিজম (১৯১৪) মতবাদের জন্ম।  এই কতগুলো মতবাদের জোর নিয়ে তারা ভারতবর্ষের শিল্পীদের অধুনিক শিল্পকলার শিক্ষা দেবেন সেটা আশা করা দূরদৃষ্টিতার লক্ষণ নয়। তাছাড়া ঔপনিবেশিকতার রাজনৈতিক বাস্তবতা, ভারতীয় জাতীয়তাবোধের প্রতি ক্রমশ বাড়তে থাকা আনুগত্য শিল্পকলার জগতে সৃষ্টি করেছিল নতুন ধরনের আত্মপরিচয়ের একটি সংকট। যার প্রতি তৎকালীন শিল্পীদের প্রতিক্রিয়াও ছিল শিল্পীভেদে ভিন্ন। তবে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে  প্রকৃত শিল্পী / সাহিত্যিকরা সব সময়ই শোষণ আর নীপিড়নের বিপক্ষে কথা বলেছেন। ‍উপরন্তু ভারতবর্ষের বাইরের শিল্পী/সাহিত্যিকদের সাথে তখন ভারত বর্ষের বা উপমহাদেশের মানুষে যোগাযোগ তেমনভাবে শুরু হয়নি আজকের মতো যে, আধুনিক সমাজে শিল্প সাহিত্যচর্চা কিভাবে হচ্ছে তার খোঁজ তারা ঘরে বসেই পেয়ে যাবেন।

abedin-zainul-1917-1976-india-crow-1729571-500-500-1729571

 

শিল্পী গগেন্দ্রনাথ ঠাকুর:
শিল্পী গগেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬৭-১৯৩৮) যিনি ছিলেন কবিগুরু রবিন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র, তিনি  বেঙ্গল স্কুলের চিত্ররীতিতে শিল্পচর্চা অব্যহত রাখতে চাননি বলে নব্য বেঙ্গল স্কুল শৈলীতে তাঁর শিল্পভাষাকে প্রকাশ করতে গিয়ে, কিউবিজমের মতো করে শিল্পকলা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। তবে তাঁর অঙ্কিত, ক্যারিকেচারগুলো ছিলো বুদ্ধিমত্তায় ভরপুর এবং তাঁর দক্ষতার স্বাক্ষর। তবে শিল্পকলার জগতে ক্যারিক্যাচোরকে কখনও হাই আর্ট বলে মনে করা হয়নি। গগেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর আধুনিকতার চর্চা করেছেন নিজের মতো করে।  তাঁর কিউবিজমকে পশ্চিমের কোনো শিল্পসমালোচক পিকাসো বা ব্রাকের কিউবিজমের সমতুল্য বলে মেনে নিতে রাজি হননি। এমনকি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরও হতাশ হয়ে ছিলেন।

রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর:
কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) যখন উপমহাদেশের শিল্পীদের বোঝাতে ব্যর্থ হলেন শিল্পকলায় আধুনিকতা কি হওয়া উচিৎ । এমনকি তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকেও বোঝাতে সক্ষম হননি, যারা সেই সময় উপমহাদেশীয় শিল্পকলাতে বিশেষ অবদান রেখে চলেছেন। শেষে তিনি নিজেই তুলি হাতে তুলে নেন এবং উপমাহদেশের শিল্পীদের, তথা সারা বিশ্বকে দেখিয়ে দেন আধুনিক ভঙ্গিমায় শিল্পকলার চর্চা করে। কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই যে  উপমহাদেশের আধুনিক শিল্পকলার উন্মুক্ত আলো প্রবেশ করা শুরু করে যাঁর হাতে তিনি হলেন রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর। এরপরেও যদিও অনেক শিল্পী আধুনিক শিল্পচর্চার নামে ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যান। রবিন্দ্রনাথের প্রতিভা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন থাকবারও কোনো অবকাশ নেই তবে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য হলো রবীন্দ্রনাথ কোনো প্রতিষ্ঠিত পেশাদারী চিত্রশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠিত লেখক এবং কবি এবং দার্শনিক বা সঙ্গিতজ্ঞ। শিল্পকলায় আধুনিকতা আসতে হবে মূলত পেশাদারী শিল্পীদের হাত ধরে, যাতে করে পরবর্তী প্রজন্ম একটি সুনিদির্ষ্ট দিক নির্দেশনা পায়। মূলত তাঁর শিল্পভাষা ছিল আত্মজীবনীমূলক,তিনি তার নিজের অন্তর্জগতকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছিলেন তার একান্ত নিজস্ব ভঙ্গিমায়।  এর ব্যতিক্রম জয়নুল আবেদিনের শিল্পভাষায় জায়গা করে নিয়েছিল সম্মিলিত জীবনের বর্ণনা, যে জীবনের বর্ণনা তার নিজস্ব শ্রেণী অবস্থানে যেমন দায়বদ্ধ, তেমনি তিনি শিল্পকলার ভাষাকেও ব্যবহার করেছেন আধুনিক শৈলীর সুস্পষ্ট ব্যকরণে। আর সেটাই আমরা আশা করি কোন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষিত এবং দৃশ্যমান চিত্রকলা নির্মাণের কোন পেশাজীবির কাছে, যাকে শিল্পী বলতে আমাদের সামান্যতম কুন্ঠাবোধ থাকে না।

14829763184_68a1990915_z

 

শিল্পী অমৃতা শের-গিল:
উপমহাদেশের শিল্পী অমৃতা শের-গিলকে (১৯১৩-৪১) ভারতীয় শিল্প সমালোচকেরা বেশ উচ্চ কন্ঠে ভারতের প্রথম সারির আধুনিক শিল্পী হিসেবে বিবেচিত করে থাকেন তবে প্রথম মহিলা পেশাদারী শিল্পী হিসেবে তাঁর মর্যাদাতো অবশ্যই অনস্বীকার্য। কিন্তু তারা এটাও বলতে দ্বিধা বোধ করেন না যে অমৃতা কখনই  জন্মগতভাবে এবং আদর্শিকভাবে ভারতীয় ছিলেন না। তাঁর জন্ম হাঙ্গেরিতে, মা ছিলেন হাঙ্গেরিয়,  পিতা ছিলেন ভারতীয়।  অমৃতা সেই সময় ইউরোপে শিক্ষালাভের সুযোগ পেয়েছিলেন এবং খুব সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি তাঁর শিক্ষার অনুশীলন করবার সুযোগ পান ভারতের মাটিতে এবং ইউরোপে। সমাজের উঁচুস্তরের সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষদের মাঝে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা এবং বাকি জীবন। তাঁর প্রতিভা বিকাশের পথ বেশ প্রশস্ত ছিলো তাঁর প্রতিভার চেয়ে। প্রথমদিকে তিনি  শিল্পী পল গগ্যাঁর প্রিমিটিভিজমে অনুকরণে শিল্পচর্চা করলেও পরবর্তিতে তিনি তাঁর জন্মস্থান হাঙ্গেরি থেকে হাঙ্গেরিয়ান শিল্প শৈলীর প্রভাবে প্রভাবিত হন।   ভারতীয় মানুষের জীবন যাত্রার কথা তিনি ইউরোপীয় প্রিমিটিভিজম বা পল গঁগ্যার শৈলীতে তুলে আনার চেষ্টা করেন। তাঁকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ভারতীয় শিল্পী যিনি কিনা ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলার চর্চা শুরু করেন, বলা প্রায় অসম্ভব । এছাড়া তার সংক্ষিপ্ত জীবন ও ট্র্যাজিক পরিণতি সুযোগ করে দিয়েছিল তাকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পুরাণের অনুপ্রবেশ ও মরণোত্তর খ্যাতি প্রতিষ্ঠাকরণে । তবে ভারতীদের জাতীয়তাবোধ বেশ গভীরে প্রোথিত, সেখানে অমৃতাকে নিয়ে তাদের গর্বের জায়গাটা বেশ স্পর্শকাতর। প্রিমিটিভিজম শিল্পশৈলীকে পশ্চিমা শিল্পকলার জগতে খুব একটা ইতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হয় না যদিও।

ams

শিল্পী যামিনী রায়:
কোম্পানীর অ্যাকাডেমিক রীতি এবং বেঙ্গল স্কুলের রীতিকে অস্বীকার করে শিল্পী যামিনী রায় (১৮৮৭-১৯৭২) নিজস্ব শৈলীতে শিল্পচর্চা শুরু করেন বলে তিনি দাবী করেন। যদিও তাঁর শিল্পকলাকেও প্রিমিটিভিজমের দলে ফেলা যায় এবং বাংলা লোকশিল্পের সাথে তাঁর শিল্পকর্মের কোনো বিশেষ পার্থক্য নেই। এমনকি কালিঘাটের পটচিত্রের সাথেও রয়েছে সাদৃশ্য। নিজেকে পটুয়া বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন তিনি। ভারতীয় অনেক শিল্পসমালোচক তাঁকে আধুনিক শিল্পী বলে বিশেষ মর্যাদার আসনে বসালেও, আমি তাঁর কাজে কোনো আধুনিক উপদান খুঁজে পাই না। বরং তাঁর কাজ আলঙ্করিক এবং নকশাবহুল। যেকোনো লোকশিল্পের থেকেও নির্জীব এবং দ্যোতনাবিহীন । আমি আগেই বলেছি কাল্পনিক এবং কাব্যময়তার স্থান আধুনিক শিল্পকলাতে নেই। সেটা শুধুমাত্র আধুনিক সময়ে সৃষ্টি হতে পারে কিন্তু গুণগত বিচারে নান্দনিকতায় আধুনিক না অবশ্যই।

পাকিস্তানি আধুনিক শিল্পকলা:
আব্দুর রাহমান চুঘতাইকে পাকিস্তানের প্রথম সারির আধুনিক শিল্পীর মর্যাদা দেয়া হয়। তাঁর কাজেও মুঘল মিনিয়েচারের অনুকরণ ছাড়া বিশেষ কোনো চরিত্র খুঁজে বের করা প্রায় সম্ভব নয় । এমনকি পরবর্তী শিল্পীদের কাজেও আধুনিকতার লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া কষ্টসাধ্য। যেমন যুবাইদা আগা (১৯২২-১৯৯৭), শাকের আলি (১৯১৪-১৯৭৫) প্রমুখদের কাজে রক্ষণশীলতা এবং ভাবপ্রবণতার প্রভাব সুস্পষ্ট। প্রহেলিকাময় শিল্পকর্ম ব্যতিত আর কিছু নয়।

ক্যালকাটা গ্রুপ:
বেঙ্গল স্কুলের ভাবাদর্শকে এবং জাতীয়তাবোধের অতিরঞ্জিত নাটকীয় শৈলীকে মেনে নিতে পারেননি নতুন প্রজন্মের কিছু শিল্পী । তাঁরা মূলত পশ্চিমা বাস্তবাদিতা বা শিল্পরীতিতে শিল্পচর্চাকে আধুনিকতার চর্চা বলে মনে করতেন। ইম্প্রেশনিস্ট, কিউবিস্ট এবং অন্যান্য শিল্পকলার মতবাদগুলো হয়ে উঠেলো তাদের অনুপ্রেরণার উৎস। সেই প্রতিবাদের প্রকাশরূপে ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ক্যালকাটা গ্রুপ।  শিল্পী পরিতোষ সেন (১৯১৮-২০০৮), শিল্পী প্রদোষ দাশগুপ্ত (জন্ম ১৯১২-মৃত্যু অজানা) , শিল্পী নীরোদ মজুমদার (১৯১৬-১৯৮২), শিল্পী  শুভো ঠাকুর (অজানা), শিল্পী গোপাল ঘোষ (১৯১৩-১৯৮০), শিল্পী জয়নুল আবেদিন প্রমুখও ছিলেন প্রতিবাদী, প্রগতিশীল শিল্পকলা মতবাদের অনুগামী। নতুন প্রজন্মের এই আভোঁ গার্দ শিল্পীরা ঐতিহাসিকতার বর্ণনা, পৌরণিক কাহিনীর অভিব্যক্তি, স্বপ্নাচ্ছন্নতার খেলা ও রূপকথার মায়াজালকে পরিত্যাগ করার চেষ্টা করেন। তারা নিজস্ব ভঙ্গিমায় শিল্পকলার চর্চার শুরু করেন। তবে তাদের অধিকাংশের কাজ ছিলো অস্পষ্ট, ধোঁয়াটে এবং পশ্চিমারীতির অন্ধ অনুকরণ। তাঁরা সবাই যেনো অনির্দিষ্ট কোনো  যাত্রার সহযাত্রী ছিলেন । সেখানে শুধুমাত্র জয়নুলের গন্তব্য ছিলো সুনির্দিষ্ট এবং ভিন্ন।

 

I believe in the God-given genius of certain individuals, and I value a society that makes their existence possible.- Kenneth Clark, Civilisation

 

জয়নুলের স্বতন্ত্রতা ও শিল্পকলার আধুনিকতায় জয়নুলের অবদান:
ব্রিটিশ শিল্প সমালোচক জন বার্জার তাঁর ওয়েজ অব সিইং বইতে বলেছিলেন, অতীত থেকে আমাদের বঞ্চিত করবার অর্থ আমাদের ইতিহাস থেকে বঞ্চিত করা।  আমাদের ভবিষ্যৎ গড়বার জন্য প্রয়োজন অতীতকে খুঁড়ে বের করে, প্রতিনিয়ত নতুনভাবে পর্যালোচনা করার মাধ্যমে। সময়ের দাবিতে অতীতকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো দরকার সত্যের নির্মোহ আলোয়। যে কাজটি করতে প্রায়শই আমরা আলস্যে ভুগি। আমাদের পর্যাপ্ত পরিমান তথ্য প্রমাণ, পুস্তক ও রশদের অভাবে আমরা পুরাতন ও সহজলভ্য ধ্যাণ ধারণাকেই আকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে ভালোবাসি। কারণ সত্যকে প্রতিষ্ঠার জন্য যে পরিমাণ পরিশ্রম ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন হয়, যে পরিমান আত্ম-বিশ্লেষণ এবং অতীত ইতিহাসকে পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়, অনেক সময়ই আমাদের সেই গুণগুলোর ঘাটতি থেকে যায়।

এই অংশের আলোচনার শূরুতেই বলে নেয়া দরকার বাংলাদেশে তিনি যেমন প্রতিষ্ঠিত, শিল্পকলার প্রথম প্রাণ পুরুষ হিসেবে তেমনি, পাকিস্তানের শিল্পসমালোচকেরাও তাকে তৎকালিন দুই পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম আধুনিক শিল্পীদের মধ্যে তাঁর নাম উচ্চারণ করে থাকেন। আমাদের উপমহাদেশের মধ্যে জাতীয়তাবোধ একটু মাত্রতিরিক্ত পর্যায়ে থাকার কারণে আমরা ভিন্ন দেশের প্রতিভাবানদেরকে নিজের দেশের থেকে অগ্রগামী বলে ধরতে কখনই স্বাচ্ছ্ন্দ বোধ করি না। এই দায়িত্ব আমাদের বাংলাদেশীদের নিতে হবে, যদিও আমরা কিংবদন্তী বলতে জোর পূর্বক কোনো ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে বিশেষ কোনো ব্যক্তির নাম প্রতিষ্ঠা করি, তাতে করে আসল প্রতিভাবানেরা আন্ধকারেই হারিয়ে যায় ।

ফরাসী শিল্পী এ্যাডওয়ার্ড মানেকে প্রথম আধুনিক শিল্পী হিসেবে মনে করা হয়। তেমনি আমাদের বাংলাদেশের মাটিতে জন্মানো জয়নুল আবেদিন ছিলেন এই উপমহাদেশের প্রথম শিল্পী যিনি তারঁ কাজে আধুনিকতার মূলসুরটি ধরতে পেরেছিলেন সফল ভাবে। ইউরোপে মানেকে একবাক্যে আধুনিক শিল্পের জনক হিসেব মনে করা হতো না একসময়, ইতিহাসের  তাঁর পর্যালোচনার প্রক্রিয়াটি ঘটেছে ধীরে ধীরে। কেন মানেকে প্রথম আধুনিক শিল্পী হিসেবে ধরা হয় তার একটা সূক্ষ ব্যাখ্যা রয়েছে । মানে ছিলেন সাহসী শিল্পী যিনি নিজস্ব শিল্পভঙ্গি অভিব্যক্ত করতে কুন্ঠা বোধ করেননি। তাঁর প্রতিবাদী স্বরুপটি বেশ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর কাজে – যেমন আমরা জয়নুল আবেদিনের কাজেও খুঁজে পাই তাঁর প্রতিবাদী ব্যক্তিত্বটিও।

যদিও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুল থেকে পশ্চিমা রীতিতে শিক্ষা লাভ করেছেন, কিন্তু তিনি অ্যাকাডেমিক রক্ষণশীল ভঙ্গিমায় শিল্পকলার চর্চ করতে চাননি । আবার এশিয় ভাবদার্শ বা কল্পনাপ্রবণ ভঙ্গিতেও তিনি শিল্পচর্চা করতে চাননি । তিনি এই দুটোর সংমিশ্রনে এক অভিনব শৈলী সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের লোক-জীবনের ধারাবহিকতাকে বিষয়বস্তু করে নিজস্ব ভঙ্গিমায় প্রকাশ করেছেন সফলতার সাথে। তাঁর বিষয় নির্বাচন থেকে শিল্পের উপাদান, পরিসর নির্বাচনে তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র।

শিল্পী জয়নুল আবেদিনের শিল্পভাষার প্রধান গুণ হলো তাঁর বলিষ্ঠ কম্পজিশন। তিনি যে কোনো কাজ খুব অল্প উপাদানে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে কম্পোজিশন করেছেন। কোনো কোনো কম্পোজিশন দেখলে মনে হয় যেনো কোনো ফিল্মের শট। একটু পরেই ক্যামেরা হয়তো ঘুরো পুরো দৃশ্যটা দর্শকদের দেখিয়ে দেবে। অনেক গুলো শিল্পকর্মে বেশ পরিচ্ছন্ন কম্পোজিশন দেখা যায় যে গুলোতে তিনি মানুষের ফিগার বা অবয়বকে ব্যবহার করেছেন বিষয় বস্তু হিসেবে । আবার অনেকগুলো রেখাচিত্রে বা পেইন্টিং এ তিনি মানুষের ফিগারগুলোকে মনুমেন্টাল ভাবে উপস্থাপন করেছেন । মানুষগুলোকে তিনি প্রকৃতির থেকে অনেক বিশাল করে দেখাতে চেয়েছেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে, যা বেশ ব্যতিক্রম সেই সময়টিতে। এমনকি তিনি একজন গাড়িয়ালের গরুর গাড়ী ঠেলার দৃশ্যকে এমন করে উপস্থাপিত করেছেন যেনো মনে হয় ভাস্কর্য অথবা এরও একটি মনুমেন্টাল আবেদন আছে । যুধবদ্ধ মানুষের কম্পোজিশন  দেখলে মনে হয় তারা ঐক্যবদ্ধ এবং সংঘটিত। তাদের শক্তি তাদের ঐক্যে এবং ভাতৃত্ববোধে।  আর প্রকৃতির কম্পোজিশন দেখলে মনে হয় বিশাল এবং বিস্তৃত, সবর্দা বেড়ে চলছে। দিগন্তের কোনো সীমা নেই যেনো।

12460031_10154781344953521_730358715_n

জয়নুল আবেদিনের তেল রঙের চিত্রকলা ব্যতিত, খুব স্বল্প, সীমিত রঙের ব্যবহার দেখা যায় কাজে। তেল রঙের চিত্রে উজ্জ্বল রঙোর ব্যবহার।  লাল হলুদ, সবুজ, ধুসর কিংবা বাদামি- এই সব রঙই প্রকৃতি বা ভূমিকে প্রতিনিধিত্ব করে। এই সব উষ্ণ রঙের ব্যবহারের কারণে তাঁর চিত্রকলাকে নিবিড় বলে মনে হয়। তারা যেনো দর্শকদের কে কাছে টানে। যেমন বিদঘুটে রঙয দর্শকদেরকে দূরে ঠেলে দেয়। তবে উষ্ণ রঙ সর্বদাই ইতিবাচক মনসিকতাকে ব্যক্ত করে। তিনি তেমনভাব শীতল রঙ ব্যবহার করেননি। তাঁর চিত্রকলাকে মানুষের যন্ত্রণার কথা থাকলেও তারা কখনও বেদনাচ্ছন্ন নয়। মোটা বলিষ্ঠ কালো রঙের রেখা জয়নুল আবেদিনের শিল্পভাষার প্রধান উপদান। চীনা ও জাপানি চিত্রকলার উন্মুক্ত জল রঙ বা রেখা প্রধান রেখা চিত্রের প্রভাব ও বলা যায়। সুনির্দিষ্ট কিছু রঙ ব্যবহারের কারণে, তাঁর শিল্পকর্মগুলো হয়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন এবং দর্শকের হৃদয়ের গভীরে খুব সহজেই জায়গা করে নিতে পেরেছে। সে দিক থেকে তিনি উপমহাদেশের ঐতিহ্যকে দিয়েছেন আধুনিকতার ছোঁয়া। মুগল মিনিয়েচারের মতোও তাঁর শিল্পকর্মে মৃদু রঙের ব্যবহার শিল্পকর্মে দেখা যায়। তিনি নিজের অবস্থান থেকে দূরে সরে যাননি। তিনি তাঁর অবস্থানে দাড়িয়েই শুধু সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন ভিন্ন মাত্রায়।

জয়নুল আবেদনি মূলত দ্বিতলে চিত্র নির্মাণ করেছেন। দ্বিতলের উপরে ত্রিমাতৃক চিত্র নির্মাণ করেছেন নিরলসভাবে। তাঁর স্ক্রল চিত্রগুলো প্রমাণ করে তিনি তাঁর শিল্প সৃষ্টির পরিসরকে মুক্ত করে দিতে চেয়েছিলেন। আকাশের মতো উদার করতে চেয়েছেন এবং দিগন্তের মতো বিস্তৃত করতে চেয়েছেন। এই সাহসিকতা সেই সময় কোনো শিল্পীই দেখাতে পারেননি। জলরঙ, চারকোল, তেল রঙ, টেম্পেরা, গোয়াশ, মোম রঙ, কালি, প্যাস্টেলের মতো সহজ সরল মাধ্যম ছিলো তাঁর শিল্প সৃষ্টির হাতিয়ার। এই সামান্য কতগুলো উপাদান বা মাধ্যম দিয়ে তিনি নির্মাণ করে গেছেন অসামান্য শিল্পকর্ম ।

শিল্পী জয়নুল আবেদিন হলেন অদ্বিতীয় এক শিল্পী যিনি ১৯৪৩ এর মন্বন্তরের  দৃশ্যকে সার্থক ভাবে চিত্রিত করে গিয়েছেন। বলিষ্ঠ  বিয়ষবস্তু, সরল রেখা, সহজলভ্য উপাদান ব্যবহার করেছেন তিনি এই রেখা চিত্রগুলো নির্মাণ করতে। আজ আর কারো অজানা নেই যে এই রেখাচিত্র গুলোই মূলত তাকে দিয়েছে বিশ্ব পরিচিতি এবং এই রেখাচিত্রগুলোর মাধ্যমেই উপমহাদেশের মাটিতে তিনি বপন করে দিয়েছে আধুনিক শিল্পকলার বীজ খুব স্বভাবজাত ভাবে। যেনো প্রাকৃতিক নিয়মেই ঘটেছে বিষয়টি। হাতের কাছে তিনি  যা পেয়েছেন শিল্প উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। স্বল্প মূল্যের এবং সহজলভ্য। তরুণ শিল্পীকে তাড়া করে ফিরেছে মানুষের সৃষ্ট এই কৃত্রিম অভাব। তিনি মেনে নিতে পারেননি দেশভাগের নামে এই নোংরামীকে। খাদ্য রাজনীতি তথা বিশ্ব রাজনীতির কুৎসিততম অবয়বকে তিনি শাশ্বত করে রাখলেন তাঁর তুলির আচড়ে। জয়নুলের সমসাময়িক আরো অনেক শিল্পীরাও দুর্ভিক্ষের চিত্র নির্মাণে অবদান রেখেছেন। কিন্তু কারো চিত্রই জয়নুল আবেদিনের মতো বলিষ্ঠ নয়। দুর্ভিক্ষের চিত্র অংকনে তিনিই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। প্রথম সারীর এমনও বহু শিল্পী ছিলেন সেই সময় যারা তখন সমাজের উঁচু স্তরের মানুষজন, তাঁরা ভুলেও মনে করেননি যে দুর্ভিক্ষ কোনো বিষয় হতে পারে, শিল্প সৃষ্টির জন্য অতিরিক্ত রোমান্টিকতায় বুঁদ হয়েছিলেন। শিল্পী জয়নুল আবেদিনের সরল, সাহসী এই রেখাচিত্রগুলো দিয়েই যেমন কলকাতায় রাস্তায় সে দিন জন্ম হয়েছিলো বাস্তববাদিতার তেমনি শুরু হয় আধুনিক শিল্পকলার যাত্রার ।

3d13f5449270d2dd8b83772c7e9ec556

জয়নুল আবেদিনের বিষয়বস্তু নির্বাচনে যে স্বতঃস্ফূর্ততা সেই সময়কার খুব কম শিল্পীদের মধ্যে লক্ষণীয়। তিনি মানুষ, প্রকৃতি, পশু পাখি, জীবন, রাজনীতি, চলমান বিশ্বের পরিস্থিতি, তাঁর চারপাশে ঘটে যাওয়া যে কোনো ঘটনাকেই তাঁর শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু করে নিতে জানতেন। একজন আধুনিক মানুষ হিসেবে তিনি তাঁর চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোতে কিভাবে প্রতিক্রিয়া করতেন, সেগুলো তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে অভিব্যক্ত করতে পারতেন সফলভাবে। এবং একজন আধুনিক শিক্ষিত নাগরিকের পক্ষে এটাই স্বাভাবিক ।

জয়নুলের শিল্পকর্মের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয় হলো সাধারণ মানুষের শ্রম। তিনি মাঝি মাল্লা, ফসলের জমিতে কর্মরত কৃষক, ঘরে ফেরা শ্রমিক বা জেলে, বাংলাদেশের পরিশ্রমী নারী পুরুষের জীবন যাপন চিত্রিত করেছেন অত্যন্ত নান্দনিক ভাবে। শ্রমিকেরা কখনও কর্মরত, কখনও নিয়তির কাছে পরাজিত, কখনও আবার উৎসবে মুখর। ১৯৭০ সালে আঁকা নবান্ন স্ক্রল চিত্রটি বাংলাদেশের জন্য একটি বিরল ও বিসম্য়কর ঘটনা। জলরঙ, মোম রঙে মিশ্র মাধ্যমে আঁকা এই চিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশর শিল্পকলার ইতিহাসে তিনি বাড়তি মাত্রা সংযোজন করে দিয়ে গেছেন।

জয়নুল আবেদিনের শ্রেষ্ঠত্ব  বর্ণনা  করে শেষ করা সম্ভব নয়। ছোট্টো একটি অবহেলিত পাখিকে কেউ শিল্পকর্মে স্থান দেবার কথা হয়তো ভাবেননি তখনও তাঁর ব্যতিক্রম ব্যক্তিত্বের প্রকাশ সেখানেই। তিনি লাস্যময়ী রমণীদের চিত্র নির্মাণ করলে আরো ভালো ভাবে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হতে পারতেন। কিন্তু তিনি অবহেলিত এই পাখিটিকে আমাদের শিল্পকলার জগতে বিশেষ স্থান দিয়েছেন।  বাঙালি সমাজের আটপৌরে জীবনের নিত্য নৈমিত্তিক সঙ্গি হলো কাক।  বাস্তবধর্মী ভঙ্গিতে অঙ্কিত তাঁর কাকগুলোকে দেখলে মনে হয় না কোনো কাক,  মনে হয় যেনো সমাজের বিপ্লবী মানুষের প্রতিকী প্রকাশ, মনে হয় যেনো উদ্ধত কোনো তরুণ, মনে হয় না ময়লা আর্বজনা খুঁজে খাওয়া কোনো নোংরা প্রাণী, মনে হয় আমাদের চেনাজানা কেউ । একজন মানুষের অবয়ব  নিয়ে সে দাড়িয়ে থাকে। কালো কাককে অলুক্ষনে বলা হয় আমাদের সমাজে। জয়নুলের কাক গুলো যেনো সাহসের বার্তাবাহক।  কত স্বল্প, রেখা ও রঙ ব্যবহার করে তিনি দক্ষতার সাথে কাক গুলোকে আঁকতেন , তাতে তাঁর দক্ষতা যেমন প্রকাশ পেয়েছে তেমনি তিনি মিনিমালিজমের আভাস দিয়ে যান তাঁর প্রকাশ ভঙ্গিমায়। আমাদের মনে করিয়ে দেন, আধুনিক শিল্পকলার প্রকাশ ভঙ্গিমায় ;  মোর ইজ লেস । লন্ডনের টেট মর্ডানের শিল্পী ইয়ানিস কুনেলিস এর দেয়ালে রেখা চিত্রের সাথে সেটে দেয়া দুটো মৃত কাককে (১৯৭৯) দেখে আমার জয়নুলে কাকের কথা ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি। জয়নুল আবেদিনের কাক আরো কয়েক দশক আগের আঁকা (১৯৪৩)। জয়নুলের আবেদিনের কাকগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় টিকে থাকার সংগ্রামে সফল এক প্রজাতির কথা।

group-4

I should paint my own places best. – John Constable

 

জন কন্সটেবলকে (১৭৭৬-১৮৩৭) ব্রিটিশ শিল্পকলায় আধুনিকতার গুরু বলা হয়। কারণ তিনিও পুরাতন ধারণাকে বাদ দিয়ে প্রকৃতির কাছে আত্ম সমার্পণ করেছিলেন। তিনি ক্রমাগত বিরামহীনভাবে ভূদৃশ্যের চিত্র নির্মাণ করে গেছেন।  জয়নুল আবেদিনের ভূদৃশ্যগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় শিল্পী কন্সটেবলের কথা। নদী, নৌকা, বিস্তৃত ভূমি, খোলা মাঠ বা ধান ক্ষেত, খোলা জায়গা, উচুঁ নীচুঁ পাহাড়, উপত্যকা। বিস্তৃত খোলা ভূমির বুকে একেঁ বেঁকে চলে নদী। ডাচ ভূদৃশ্যের সাথেও যার রেয়েছে সদৃশ্যতা । বাংলাদেশের অপরূপ রুপের যে সহজ সরল বহিঃপ্রকাশ তা জয়নুল আবেদিনের আগে কেউ অংকন করতে পারেনি। নিজভূমির এমন অপার সৌন্দর্য্য শিল্পকর্মে সাবলিলভাবে আশ্রয় দেয়ার মতো সাহসিকতায় বা কার ছিলো। সীমিত কিছু রঙ ও রেখা ব্যবহার করে জল রঙে বা রেখা চিত্রে তিনি যে ভূদৃশ্য নির্মাণ করে গেছেন তা তাঁর অকৃত্রিম দেশপ্রেমের অভিব্যক্তি।

জয়নুল আবেদিনের কাজ আর প্রকৃতিকে কোনো ভাবেই আলাদা করা সম্ভব নয়। কারণ তিনি প্রকৃতির কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। একজন শিল্পীর জন্য প্রকৃতির থেকে মহান কোনো শিক্ষক আর কেউ হতে পারে না।  প্রকৃতির নানা উপাদান তিনি তাঁর কাজে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। প্রকৃতির ভালো মন্দ সব কিছুকে তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে ধরে রাখতে চেষ্টা করেছেন। যেমন ভূদৃশ্য অংকন, গাছ পালা, পশু পাখির ব্যবহার, প্রাকৃতি দূর্যোগের চিত্রও তিনি অংকন করেছেন। বিষয়ের বৈচিত্রতা নির্মাণে তাঁর দক্ষতা অনবদ্য। তেমনি প্রকৃতির রুক্ষ দিকটিও তুলে ধরতে পিছপা হননি। মনপুরা স্ক্রল চিত্রটিতে তিনি ১৯৭০ সালের জলোচ্ছাস পরবর্তী ভয়াবহতার দৃশ্য চিত্রিত করে গেছেন।

জয়নুলের কাজে যুগল দম্পতি বিষয় হয়ে এসেছ বেশ অনেকবার। তাঁর সুপুরুষ ব্যক্তিত্বের গভীরে যে প্রেমিক মন তিনি তা লুকাতে পানেনি। হয়তো চেষ্টাও করেননি। তিনি সাঁওতাল যুগলের চিত্র অংকন করেছেন। তিনি যুগল হিসেবে এঁকেছেন সাঁওতাল রমণীদের। যুগল পুরুষ, এমনি জোড়া পশুরও চিত্রে নির্মাণ করেছেন। পরিবারের চিত্র, যুথবদ্ধ মানুষের চিত্র অংকন করেছেন। তাঁর মৃত্যু শয্যাতেও তিনি শেষ চিত্র হিসেবে এঁকেছেন যুগল মুখাবয়ব।

group-5

জয়নুল আবেদিনের দক্ষতার গোপন সূত্র হলো তাঁর পর্যবেক্ষণ অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি তাঁর চোখকে এমন ভাবে তৈরী করে ফেলে ছিলেন যে, কয়েক মুহূর্ত দেখা মাত্র তিনি একজন মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হতেন তাঁর রেখাচিত্রের মাধ্যমে। আমরা দেখি তিনি খুব অল্পকতগুলো রেখার মাধ্যমে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর বা নজরুল ইসলামের মতো ব্যক্তিত্বদের প্রতিকৃতি নির্মাণ করেছেন। এছাড়া অন্য যে কেনো প্রতিকৃতি চিত্রনে তিনি সেই বিশেষ ব্যক্তিটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরতে সক্ষম হতেন । যেমন ব্যক্তিটির রেখাচিত্র দেখা মাত্রই দর্শক বুঝতে সক্ষম যে তিনি কোন পেশার মানুষ।

মুক্তিযুদ্ধে মতো সাম্প্রতিক বিষয় নিয়েও তিনি চিত্র নির্মাণ করেছেন । এমনকি সুদূর প্যালেস্টাইন ভ্রমনে গিয়ে তিনি সেখান মানুষের দুঃখ দুর্দশার চিত্র অংকন করেছেন। স্প্যানীশ শিল্পী ফ্রান্সিসকো গয়ার (১৭৪৬ -১৮২৮) মতো তিনি সমাজের অন্যায় অত্যাচারের কথা তাঁর কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করে গেছেন।

শিল্পী জয়নুলের গুরুত্বপূর্ণ অবদান বাংলাদেশে শিল্পকলা শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। যে সুবিধা তিনি নিজ দেশে থাকতে পাননি। এটা বলা বাহুল্য যে, তখন বাংলাদেশে শিল্পকলা শিক্ষার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান ছিলো না । ১৯৪৮ সালে প্রথম তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আজকের চারুকলা অনুষদের প্রথম রূপ। তিনি সময়টা তাঁর খ্যাতি অর্জনের পেছনে ব্যয় করতে পারতেন। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো তিনি শিল্পকলা চর্চার মধ্যে  সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়েন। ফলে তাঁর সমাজের মানুষ এবং দেশের মানুষ উপকৃত হয়েছেন। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে জয়নুল বাংলাদেশের মানুষের জন্য নিজের পেশাগত জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। শুধু তাই নয়, ১৯৭৫ সালে,  সোনারগাঁতে গড়ে তোলেন বাংলাদেশের লোক শিল্প যাদুঘর । যা ছিলো  তাঁর বহু দিনের স্বপ্ন , এই সব অবদান তাঁকে আরো বেশী করে একজন আধুনিক সভ্য সমাজের অনুকরণীয় একজন মানুষ করে তোলে।

group-3

শিল্পী জয়নুল আবেদিনের রাজনৈতিক সচেতননা, তাঁর আত্ম পরিচয়ের অনুসন্ধানের পরিক্রমার প্রতিবন্ধকতা তাঁর চলার পথে যেমন বাধার সৃষ্টি করেছে তেমনি তাঁকে অসীম সাহসও যুগিয়েছে। তাঁর পরিচয় ছিলো বেশ জটিল তিনি ব্রিটিশ উপমাদেশের পূর্ব বাংলায় জন্ম গ্রহন করেন, তাঁর শিক্ষা জীবন কাটে ভারতের কলকাতায় এবং পরবর্তীতে দেশ ভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা ছিলেন, সর্বশেষে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। প্রথম জীবনে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন এবং সব পরিস্থিতিতে তিনি রাজনৈতিক ভাবে ছিলেন সক্রিয় এবং তাঁর অবস্থানও ছিলো স্বচ্ছ এবং সৎ। শিল্পী  দিয়েগো রিভেরার (১৮৮৬-১৯৫৭) এবং শিল্পী ফ্রিদা কাহলোর (১৯০৭-১৯৫৪)  সাথে এক্ষেত্রে সদৃশ্যতা মেলে। যারা কমিউনিজমকে কেন্দ্র করে শিল্পচর্চা করেছেন এবং প্রচলিত ধারার পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছেন।

জয়নুলের কাজে যে শিশু সুলভ সরলতা এবং সততার দেখা মেলে যে কোনো শিল্পপ্রেমিক এই সাদৃশ্যতা খুঁজে পাবেন।  ভ্যান গো এর মতো তিনি নিজেকে প্রকাশ করেছেন প্রকৃতির মাধ্যমে, মানুষের মাধ্যমে। ভিনসেন্ট ভ্যান গো এর মতো সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ দিনের শেষে যেমন শুধু এক টুকরো আলু খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে, তেমনি জয়নুলের কাজে অসাধারণ ভাবে ফুটে ওঠে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দিনের দৃশ্যবলিও। যেখানে তারা একটি আগুনের চারপাশে  ঘিরে বসে  থাকে,  শীতের সন্ধ্যায় একটু উষ্ণতার আশায়। শিল্পী জয়নুল আবেদিন তাঁর সীমিত ব্রাশ স্ট্রোক এবং জলরঙের আভাসে ফুটিয়ে তুলেছেন, আগুনের ধোঁয়া , মানুষের জড়ো সড়ো হয়ে বসার ভঙ্গিমা এবং খুঁটিনাটি সব বিষয়াদি। ভ্যান গো এর রেখাচিত্রের মতো জয়নুলের রেখা চিত্রে ফুটে উঠেছে গ্রামের সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার মহাকাব্য।

বাস্তবতা হলো আধুনিকতার পূর্বশর্ত। ফরাসী শিল্পী জ্যাঁ-ফ্রাসোয়া মিলে (১৮১৪-১৮৭৫) অগুস্তাভ কুর্বের (১৮১৯-১৮৭৭) মতো জয়নুল আবেদিন উপমহাদেশের শিল্পকলায় বাস্তবতার জন্মদিয়ে গেছেন। কর্মরত শ্রমিকদেরকে যারা নিজের শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু করেছিলেন সবার আগে। জীবনকে বাস্তব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন যারা। পশ্চিমা শিল্পকলার জগতে আধুনিকতার শুরুটাও হয়েছিলে বাস্তববাদিতা দিয়ে তার ব্যতিক্রম ঘটেনি আমাদের এই উপমাহদেশেও। কারণ বাস্তবতার দিকে পা দেবার অর্থই হলো আধুনিকতার দিকে পা বাড়ানো।

group-2

বাস্তবতার কদর্যতাই আধুনিকতার আয়না:
ভারতীয় ব্রিটিশ শিল্পকলার ইতিহাসবিদ পার্থ মিত্রও স্বিকার করেছেন যে এখন ভারতীয় শিল্পকলায় যে আধুনিকতার মুক্ত হাওয়া বইছে সেখানে আনিশ কাপুরের মতো ভারতীয় শিল্পীও নির্দিষ্ট কোনো মানচিত্রের সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ থাকতে রাজি নন। আমাদের আজকের এই সুবাতাসের দরজা যিনি খুলে দিয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন আমাদের প্রিয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। আধুনিক শিল্পকলার শুরুটা পরিচয় করিয়ে দেবার ক্ষেত্রে, শিল্পী জয়নুল আবেদিনের অবদানের সাথে সুস্পষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে কবি জীবনানন্দ দাশের আধুনিক কবিতার  সৃষ্টির সাথে। সাহিত্যের প্রাঙ্গনে কাঁদা মাটি মাখা পথে আমাদের হাটিয়েছেন যেমন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তেমনি শিল্পকলার পথে জয়নুল আবেদিন।  যদিও খুব দৃঢ়ভাবে বলা সম্ভব না যে, সর্বত্রই তিনি আধুনিকতার আলো ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন সফলতার সাথে। ব্যর্থতার দায়ভার তাঁর একার নয় অবশ্যই । সে দায়ভার আমাদের সমাজের ঘাড়ে যেমন বর্তায় তেমন প্রতিটি শিল্পীর কাধেও।

জয়নুল আবেদিনের শেষের দিকের  কাজে কিছুটা কিউবিস্ট বা পিকাসোর বা জাতিয়তাবোধের প্রকাশ থাকলেও তিনি বাংলাদেশ নামক ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্রকে, বিশ্বের শিল্পকলা দেখবার জন্য দিয়েছেন ছোট্টো একটি জানালা । তিনি আধুনিকতা শব্দটির সাথে শিল্পীদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন শিল্প হলো এমন একটি ভাষা, যে ভাষা, দেশ, জাতি, সমাজ, ধর্ম সব কিছুর উর্ধ্বে গিয়ে একজন মানুষের একান্ত নিজস্ব চিন্তার প্রকাশ করবার একটি মাধ্যম মাত্র।  সে তাঁর চারিদিকের ঘটে যাওয়া ঘটনাকে তাঁর ভাষায় অভিব্যক্ত করে গেছেন। রেখে গেছেন ইতিহাস আমাদের মতো নতুন প্রজন্মের জন্য।  একজন শিল্পী শুধু শিল্পকর্মেই আধুনিক হবেন না, হবেন তার জীবন যাপনে, কারণ জীবন যাপনই একজন শিল্পীর শিল্পকর্ম । ব্রিটিশ শিল্প সামলোচক ও ইতিহাসবিদ গমব্রিখের ভাষায়,  শিল্পীই মুখ্য, শিল্পকর্ম নয়।

পরিশেষে:
আমরা জেনেছি যে, অজন্তার দেয়াল থেকে নিয়ে কোনো কোনো শিল্পী কল্পনাপ্রবণাতাকে আশ্রয় করে বেঁচে ছিলেন। সেখান থেকে তারা পৌরণিক কাহিনী চিত্রনের জন্য অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। কিন্তু অজন্তার দেয়ালের ৯ ও ১০ নম্বর গুহার চিত্রে  বর্ণিত বাস্তব জীবনের রেখাচিত্রেরও চিহ্ন মেলে। যার শুরুটা হয়েছিলো খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দির শেষ বা প্রথম শতাব্দির শুরুর দিকে। সেখানে দেখা যায় ভারানসির রাজার শিকারের দৃশ্য। সেই একি গুহাচিত্র থেকে জয়নুল ছেঁকে তুলে নিয়েছে বাস্তবতার নির্যাস টুকু। এবং এখানেই তাঁর বুদ্ধিবাদিতার প্রকাশ। আমার বক্তব্যের মূল সূর হচ্ছে, জয়নুল আবেদিন ছিলেন উপমহাদরে প্রথম পেশাদারি শিল্পী যিনি শিল্পকলার আধুনিকতা বিষয়টিকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং নানা ভাবে তাঁর বহুমূখি কাজের মাধ্যমে তিনি  তাঁর আধুনিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আধুনিক শিল্পকলার চর্চার জন্য আমাদের প্রয়োজন আগে একটি আধুনিক সমাজ গড়ে তোলা, কুসংস্কার মুক্ত, আত্মবিশ্বাসী এক সমাজ যেখানে মানুষ আত্মপরিয়ে পরিচিত হবে, নিজের নিজস্বতাকে সাবলীল ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে তার কাজে, শিল্পকর্মে বা সাহিত্যে। আমার মনে হয়, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সেই জায়গাাটতে সফল হয়েছিলেন। তিনি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন যে আধুনিক হবার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো একজন সৎ মানুষ হওয়া। সৎ হবার সঙ্গে সঙ্গে পরিশ্রমী এবং আত্মসচেতন হওয়াটাও কতটুকু জরুরী। প্রতিভাবান হওয়াটাই্ শেষ কথা নয়। একজন কিংবদন্তী হবার জন্য নিজের যোগ্যতা তিনি প্রমাণ করে গেছেন তাঁর কাজের মাধ্যমে।

group-1*নামকরণ করা হয়েছে কেনেথ ক্লার্কের সিভিলাইজেশন থেকে।

ফেসবুক এ্যালবামের লিংক:
https://www.facebook.com/Meetasultana/media_set?set=a.10154454136058136.1073741930.747803135&type=3&pnref=story

https://www.facebook.com/Meetasultana/media_set?set=a.10154454126888136.1073741929.747803135&type=3&pnref=story

চিত্রসূত্র: অন্তর্জাল
তথ্যসূত্র:
ওয়েজ অব সিইং, জন বার্জার (অনুবাদ: আসমা সুলতানা এবং কাজী মাহবুব হাসান)
সিভিলাইজেশন, কেনেথ ক্লার্ক (অনুবাদ: আসমা সুলতানা এবং কাজী মাহবুব হাসান)
জয়নুল আবেদিনের জিজ্ঞাসা: বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ছবি কাকে বলে: অশোক মিত্র
ভারতের চিত্রকলা: অশোক মিত্র
দি মিনিং অব আর্ট: হারবার্ট রিড (অনুবাদ : সন্দীপন ভট্টাচার্য )
বাংলাদেশের চিত্রকলা: মইন্নুদীন খালেদ
সমকালীন শিল্প ও শিল্পী: নজরুল ইসলাম
Gardner’s Art through the Age: The Non western Perspective
Shock of the New: Robert Hughes
Master drawing: The Woodner collection
Indian Art: Partha Mitter
The Triumph of Modernism: India’s artists and the avant garde – 1922-1947: Partha Mitter
Modernism and the Art of Muslim South Asia: Iftikhar Dadi
This is Modern Art:
The Story of Art:  Gombrich
Very Short Introductions of Modern Art:  David Cottington
The Social History of Art Vol 4 – Naturalism, Impressionism, the Film Age

লিংক:

http://parthamitter.com/books.html

http://inventors.about.com/od/pstartinventions/a/stilphotography.htm
http://www.theartstory.org/definition-modern-art.htm
http://www.tate.org.uk/learn/online-resources/glossary/m/modernism

(*লেখাটি গত ২রা জানুয়ারি, ২০১৬, অনলাইন পত্রিকা সিলেটটুডেতে প্রকাশিত হয়েছিলো: http://www.sylhettoday24.com/news/details/Arts/14371 )

Beyond Measure: Domesticating Distance

evite-beyond measure
Beyond Measure: Domesticating Distance
শীর্ষক এই প্রদর্শনীটির আয়োজন করেছে দি রবার্ট ম্যাকলঘলিন গ্যালারী (The Robert McLaughlin Gallery), অশোয়া, কানাডার সহযোগিতায় SAVAC (South Asian Visual Art Centre)।

প্রদর্শনীতে দক্ষিন এশিয়ার মোট পাচঁ জন সমসাময়িক শিল্পীর শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে যারা প্রত্যেকেই জন্মভূমির বাইরে প্রবাস জীবনের শূন্যতা আর প্রাপ্তি নিয়ে কাজ করছেন। অংশগ্রহনকারী শিল্পীরা – তাজিন কাইয়ুম, আব্দুল্লাহ এম.আই সাইয়েদ, আসমা সুলতানা, সুরেন্দ্র লাওটি এবং মীরা মার্গারেট সিং – প্রত্যেকেই তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দ্বৈততা এবং এর মাধ্যমে উদ্ভুত মিশ্র পরিচয়ের ব্যবচ্ছেদ করেছেন সহজাত বিশ্লেষণী দক্ষতায়। তাদের শিল্পকর্মে সম্মিলিতভাবে অনুভব করা কাহিনীতে আমরা দুটি পরিচয় আর স্থানের মধ্যবর্তী শুন্যতাকে বাঙময় হয়ে উঠতে দেখি। স্মৃতিচারণ, আখ্যাণ এবং পর্যবেক্ষণ আর ভাবনায় পুষ্ট তাদের কাজ অচেনা ভূমিতে চেনা প্রান্তর আর বর্তমানের সময়ের কাঠামোয় অতীতকে পুনব্যবহার করে দেশান্তরের প্রাসঙ্গিকতায় নিজেদের আত্মপরিচয় খোজার খোজার প্রচেষ্টাকেই জীবন্ত হয়ে উঠতে দেখি। স্থাপনা শিল্প, পারফরমেন্স, আলোকচিত্র, ভিডিও, ভাস্কর্য  নানা মাধ্যমের সম্মিলনে শিল্পীদের বহুমাত্রিক সৃষ্টির এই পদর্শনীটি তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বৈচিত্রময়তায় সমৃদ্ধ। ওন্টারিও আর্ট কাউন্সিল এর Culturally Diverse Curatorial Project grant এর পৃষ্ঠপোষকতায় প্রদর্শনীটি কিউরেট করেছেন আম্বরীন সিদ্দিকী।

অনুষ্ঠান সূচী:

উদ্বোধন –

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর – সন্ধ্যা ৭ থেকে রাত ১০ টা।
দি রবার্ট ম্যাকলঘলিন গ্যালারী
The Robert McLaughlin Gallery
72 Queen St, Oshawa, ON
(905) 576-3000

সিম্পোজিয়াম:

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর – সকাল ১১ থেকে দুপুর ৩টা
দি রবার্ট ম্যাকলঘলিন গ্যালারী
Free (including optional return bus trip to the gallery)
সিম্পোজিয়ামে আলোচনায় অংশ নেবেন শিল্পী সুরেন্দ্র লাওটি, তাজিন কাইয়ুম, আসমা সুলতানা এবং সিডনী প্রবাসী শিল্পী আবদুল্লাহ এম আই সাইয়েদ। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করবেন: কিউরেটর আম্বরীন সিদ্দিকী।
আলোচনা প্যানেল:
• Blur -Tazeen Qayyum
• The Flying Rug of Drones and Soft Target – Abdullah M.I. Syed
• Wherever The Glimpse of a Free Spirit Exists That Will Be My Home, Asma Sultana
• From the Diaspora, Surendra Lawoti

Theoretical content: Camille Paglia

Independent Production

Whilst conducting some research for my project, I came across a writer called Camille Paglia. In 2004 she wrote a journal article for Art Documentation named ‘The Cruel Mirror: Body Type and Body Image as Reflected in Art. Here I came across some interesting ideas that seem to fit perfectly with the project I have in mind.

The main object of my project is focused on societies obsession with beauty; and how this makes girls feel a certain inadequacy towards their body image.

Paglia, like me, wrote this article expressing the woes of beauty, where she drew her ideas based on famous writings ad films in history. She claimed that the title of the article was inspired by Walt Disney’s animated movie, Snow White and the Seven Dwarfs (1937), ‘Where the elegant witch-queen… is obsessively preoccupied with her brutally candid mirror.’ Another piece she drew inspiration from was Oscar Wilde’s The Picture of Dorian…

View original post 255 more words

নির্বাসিতের নির্বাসন

নভেরা আহমেদ
শিল্পী নভেরা আহমেদের প্রতিকৃতি, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

নির্বাসিত শিল্পী নভেরা আহমেদ, চিরকালের জন্য নির্বাসনে চলে গেলেন । ভাস্কর নভেরা আহমেদের মৃত্যুতে আমরা বাঙালিরা শোকাহত । দেশে বা প্রবাসে সবখানেই শিল্পী নভেরার মৃত্যুর শোকের চিহ্ন। কোনো মৃত্যুই কাম্য নয় । তা সে পূর্ণ বয়সের মৃত্যুও হোক না কেনো । মানুষ কখনই তার প্রিয়জনকে হারাতে চায় না । আর সে যদি হয় অসাধারণ প্রতিভাবান কেউ তবে তো কথাই নেই । আপনজন কেনো, কাছের-দূরের কোনো মানুষই সেই চলে যাওয়াকে সহজভাবে মেনে নিতে পারে না । মানুষ চায় তার স্মৃতিকে অবিস্মরনীয় করে রাখতে । তার চলে যাওয়াকে মেনে নিতে পারলেও, সময়ের একটা কঠিন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় সবাইকে । একমাত্র সময়ই পারে, সব কিছুকে ভুলিয়ে দিতে । সময়ের কথায় মনে পড়ে গেলো, নভেরার জীবনের বিভিন্ন সময়ের সমসাময়িক পারিপার্শ্বিকতার কথা। আমরা নভেরা সম্পর্কে কতটুকু জানতে পেরেছি আসলে?

ওয়ান্স ইন আমেরিকা, শিল্পী নভেরার সৃষ্টি, ৬৮-৬৯
ওয়ান্স ইন আমেরিকা, শিল্পী নভেরা আহমেদের সৃষ্টি, ৬৮-৬৯, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

বাস্তবে, শিল্পী নভেরা সম্পর্কে তেমন করে জানার উপায় নেই । যেমন করে আমরা বাংলাদেশের আর যে কোনো শিল্পী বা শিল্পকলা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে অজানা একটা অন্ধকারে বাস করে আসছি। শিল্পী নভেরা আহমেদের কথা আরো বেশী রহস্যময় এবং অন্ধকারে ঘেরা। কারণটা হয়তো কারো আর অজানা নেই। তিনি ছিলেন স্বেচ্ছায় নির্বাসিত। চার দশক সময় ধরে। চল্লিশটা বছর, কম সময় নয় মহাকালের হিসাবেও। ৮৫ বছরের দীর্ঘ জীবনের প্রায় অর্ধেকটা তিনি বাংলাদেশ থেকে দূরে । বাংলাদেশ বললে হয়তো ভুল হবে; তিনি বাংলাদেশের শিল্পী ছিলেন কি ; বা স্বাধীন বাংলাদেশ বললে হয়তো আরো সঠিক করে বলা হবে । তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কখনও স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেননি। তিনি তাঁর নিজের জন্মভূমি থেকে ছিলেন স্বেচ্ছায় নির্বাসিত। সেই সময় যাকে সবাই ভারতীয় উপমহাদেশ বলে জানতো, পরবর্তীতে পূর্বপাকিস্থান! আমরা সেই অবস্থান থেকে আসলে তাকে কতটুকু আমাদের দেশের শিল্পী বলে দাবী করতে পারি আমার জানা নেই । তেমন করে তো আমরা বাংলাদেশের মাটিতে জন্মগ্রহনকারী সূচিত্রা সেনের মতো এবং আরো অনেকে আছেন তাদেরকে, আমাদের নিজেদের বলে দাবী করতে পারি। যিনি চল্লিশ বছর আগে আমাদেরকে পিছনে ফেলে চলে গিয়েছেন এবং ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করেননি, তাকে আমাদের বলে অধিকার করবার অধিকার আমাদের আছে কিনা জানি না। মূলত কোন কারণে তিনি দেশ ত্যাগী হলেন সেটাও আমরা জানি না। আমরা কেনই বা জানতে চায় ? কারণ তিনি আমাদের দেশের (?) অর্থাৎ তৎকালীন পূর্বপাকিস্থানের শিল্পী ছিলেনএবং তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় মানুষ, সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষ, তাঁর সম্পর্কে আমরা, সাধারণ মানুষেরা জানতে চায়বো সেটাইতো স্বাভাবিক । কিন্তু আমাদের হয়তো কখনও জানা হবে না, দেশ ছেড়ে যাবার পরেও, কেনো তিনি আমাদের প্রিয় দেশ, বাংলাদেশের মাটিতে কোনোদিনো ফেরার কথা ভাবেননি। বাংলাদেশের জন্মের আগেই তিনি নিজের জন্মভূমি ছেড়ে বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমিয়েছেন এবং সেই দেশকে তিনি আপন করে নিয়েছেন।

নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য
শিল্পী নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

আমরা জানি, তিনি কোনো  সুবিধা বঞ্চিত পরিবারের সদস্য ছিলেন না। তিনি বেশ ভাগ্যবতীও ছিলেন, যার এমন অনেক বন্ধুমহল ছিলো যারা তাঁকে, তাঁর প্রতিভার মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন । তাহলে তাঁর জীবনে মূলত বাধা বা প্রতিবন্ধকতাটা কোথায় ছিলো ? জীবনের প্রথমদিকে তিনি বেশ সুযোগ সুবিধা পেয়েছেন, ইংল্যান্ড ও ইউরোপে শিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়েছেন, সে সময় অনেকের জন্য যা ছিলো শুধুই স্বপ্নের মতো। অনেকের জন্য এখনও সেটা স্বপ্নই বটে। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পেয়েছেন প্রদর্শনীর সুযোগ । কিন্তু তাঁর পথচলাকে শেষ পর্যন্ত কেনো একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেননি তা আমাদের আর হয়তো জানা হবে না । কারণ শিল্পীর কাজ বা পথচলা সম্পর্কে যদি কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারে , সে হলো শিল্পী নিজে । আমাদের দেশে সেই সুযোগ অনেক ক্ষীণ । তার কারণ হিসেবে আমি বলতে পারি সহজেই; আমাদের প্রকৃত শিক্ষার এবং অভিজ্ঞতার অভাব, সর্বপরি আমাদের সততার এবং স্বচ্ছতার অভাব । তিনি তাঁর সেই অসাধারণ স্কুলিংকে ব্যাবহার করে তাঁর কাজকে আরো পরিশালিত করতে পারতেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতাগুলো কে তিনি আরো অভিব্যক্তিময় করে তুলতে পারতেন ।

শিল্পকর্মের মাঝে শিল্পী নভেরা আহমেদ
শিল্পকর্মের মাঝে শিল্পী নভেরা আহমেদ, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

তাঁর কাজের প্রতিবন্ধকতা বলতে যদি অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা বলে আমরা ধরে নেই তাহলেও সেটি খুব একটি যুক্তিযুক্ত হবার কথা নয় । কারণ, ষাটের দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত তিনি যদি ফ্রান্সের মতো পৃথিবীর ধনী দেশ এবং প্যারিসের মতো শহরে বসবাস করতে পারেন যেটা কিনা শিল্পকলার তীর্থ স্থান । সেখানে বিভিন্ন ভাবে অর্থনৈতিক সহোযোগিতা মেলা সম্ভব। আর সেটাও যদি না অর্জন করা সম্ভব তাহলে আমাদের সেটাকে চিহ্নিত কার উচিৎ শিল্পী হিসেবে যে, প্রবাসে বসবাসরত শিল্পীদের কাজের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত কি কি ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখিন হই । এবং সেখান থেকে আমাদের মুক্তির উপায় কি হতে পারে । অথবা যদি ধরে নেই তাঁর কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো ছিলো শারীরিক, তাহলে আমাদের স্পর্শকাতর একটা অবস্থান থেকে বিষয়টাকে বিচার করতে হবে । এবং এটাও আমাদের জানার মধ্যে রাখতে হবে যে পৃথিবীতে শিল্পী মূলত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেই বেড়ে ওঠে । সোনার চামচ মুখে দিয়ে কেউ শিল্পী হয়ে জন্মায় না বা গোলাপের পাপড়ি বিছানো বিছানাতে শুয়েও কেউ শিল্পী হয়ে ওঠে না । শিল্পী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা কোনো ভাবেই মসৃন নয় । শিল্পীর সৃষ্টিই শুধু তার পরিচয় নয়, তার জীবন যাপনই একটি অনবদ্য শিল্পকর্ম হয়ে ওঠে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে। যেটাকে লাইফ স্টাইল বলা যায় ! সে ক্ষেত্রে নভেরার কথা আমরা যতদূর জানতে পারি তিনি শারীরিক ভাবে বিদ্ধস্থ ছিলেন । নানা দূর্ঘটনার কারণে তাকে শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে । সে ক্ষেত্রে তিনি ভাস্কর্য ব্যাতিরেকে অন্য আরো অনেক সহজ মাধ্যমেও কাজ করতে পারতেন । হয়তো করেছেনও । আমাদের সঠিক করে জানা নেই ।

নভেরা আহমেদ ও তারঁ স্বামী
নভেরা আহমেদ ও তারঁ স্বামী গ্রেগোয়ার দো ব্রোয়ানস, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

আমাদের জাতীয় শহীদ মিনারে নকশাকে ঘিরে আরো যে নীলনকশার জন্ম হয়েছে, আরো যে ষড়যন্ত্র বা অন্ধকারের জন্ম হয়েছে, সেটার মীমাংসা করার দায়িত্ব তাদের ছিলো যারা এর সাথে শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন। আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে যদি সে সম্পর্কে কোনো ভুল তথ্য জানি, সে ক্ষেত্রে দোষটা আমাদের ঘাড়ে না দেয়াটাই উত্তম। আমাদেরকে ক্রমাগত ভাবে আমাদের অতীত ইতিহাসের থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে । সে কারণে আমরা ভবিষ্যত থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি জাতি হিসেবে । বর্তমান বলে তো কোনো কিছুর অস্তিত্ত্ব নেই আমাদের । সব কিছু বায়বীয় । ভিত্তিহীন । শহীদ মিনারের নকশা নিয়ে যে টানাহেচড়া চলছে; তাতে মনে হচ্ছে আমাদের পক্ষে আর কোনো নতুন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা সম্ভব নয় । আমরা কি পারি না নতুন করে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিস্তম্ভ গড়তে ; আমাদের নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের দিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে । পুরাতন স্মৃতিস্তম্ভের পাশাপাশি নতুন করে বা পরিবর্ধিত অবস্থায় কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে?

Original_Model_of_Shaheed_Minar
১৯৫৬ সালে প্রণীত শহীদ মিনারের আদি নক্‌শা ও মডেল, শিল্পী হামিদুর রহমান।চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

শিল্পী নভেরার এই চলে যাওয়াকে ঘিরে আমাদের বাংলাদেশীদের মধ্যে যে কম্পনের সৃষ্টি হয়েছে তাতে করে আমরা আরো বেশী করে জানতে পারি ব্যক্তি নভেরা সম্পর্কে । আর্ন্তজালিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমাদের পরিধিটা বেশ ব্যাপ্তি পাচ্ছে দিন দিন ; বিধায় আমরা আরো বেশী করে জানতে পারছি ব্যক্তি মানুষের কথা। কিন্তু আমাদের জ্ঞানের সীমানা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখনও সেই সংকীর্নতায় ঘিরে আছে , আছে অন্ধকার হয়ে। নভেরার শিল্পকর্ম সম্পর্কে বিশ্লেষণী কোনো আলোচনা বা সমালোচনার অবকাশ নেই খুব একটা ।

বেশ কয়েক বছর ধরে অর্ন্তজালের সুবাদে নভেরা সম্পর্কে বেশ কিছু সমসায়িক এবং নিকট অতীতের খবর জানতে পারি । আর লেখক হাসনাত আবদুল হাই এর ‘নভেরা’ বইটির কথা তো মনে আছেই; যদিও বেশ কয়েক বছর আগের পড়া । সব মিলিয়ে শিল্পী নভেরার প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহের কমতি ছিলো না কোনোদিনও । কিন্তু শিল্পী নভেরা কি আমাদের কথা ভেবেছেন কখনও । হয়তো ভাবতেন । তাঁর শাড়ী পরে ফরাসী স্বামীর সাথে ছবি দেখলেতো তাই মনে হতে পারে । কিন্তু তিনি কেনো নিজে থেকে আমাদের জন্য দু লাইন লিখে রেখে জাননি ? কেনোই বা তিনি নিজের কাজেরও তেমন কোনো বর্ণনা দিতে আগ্রহ বোধ করেনি তাঁর জন্মভূমির মানুষদের জন্য, তাঁর শুভাকাঙ্খিদের জন্য ? আমরা আমাদের অবস্থান কে সুস্পষ্ট একটা রুপ দিতে ব্যর্থ হচ্ছি বারবার । ফলে ক্রমাগতভাবে আমরা ভ্রান্তিময় একটা জগৎ সৃষ্টি করে যাচ্ছি।

কর্মরত ভাস্কর নভেরা আহমেদ
কর্মরত ভাস্কর নভেরা আহমেদ, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

তাঁর অভিমানের গভীরতায় মনে হয় তিনি গভীর ক্ষত (?) নিয়ে দেশ ত্যাগ করেছিলেন । তাঁর দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের এক ফেইসবুক পোস্ট থেকে যেটা জানান যায় তাতে করে মনে হয় খুব বালখিল্য একটা কারণে তিনি দেশ ত্যাগ করেছেন এবং পারিবারিক কারণে দেশ ত্যাগ করা আর রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে দেশ ত্যাগ করা ভিন্ন বিষয় । তিনি যদি ব্যক্তিগত কারণে দেশ ত্যাগ করে থাকেন সে ক্ষেত্রে জাতি হিসেবে আমাদের অপরাধবোধে ভোগানোর কোনো অধিকার হয়েতো নেই । তবে দেশ ত্যাগের তাঁর সেই ক্ষতটুকুই যথেষ্ট ছিলো একজন শিল্পীর শিল্পচর্চার জন্য । একজন শিল্পীর পথচলার জন্য । ফ্রিদা কাহলোর কথা মনে হতে পারে আমাদের । তাঁর শরীরে সে কত যন্ত্রণা বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে । তারপরেও তাঁর কাজের মধ্যে সে সব যন্ত্রণাকে সে অভিব্যক্ত করতে দ্বিধা বোধ করেনি । নভেরা আহমেদের কাজের মধ্যে তাঁর জীবনবোধের যন্ত্রণার সানাইয়ের সুর বাজতো কিনা আমি জানি না । আমি দেখিনি তাঁর চিত্রকর্ম নিজ চোখে । হ্যা অবশ্যই অতীতের কিছু ভাস্কর্য ছাড়া ; তবে তেমন কোনো গভীর বেদনাবোধ ধরা পড়ে না তাঁর কাজে ।

হেনরী মুরের ভাস্কর্য
১৯৪৭ এ নির্মীত হেনরী মুরের ভাস্কর্য ফ্যামিলি গ্রুপ, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

শিল্পী বা ভাস্কর নভেরার কাজে ব্রিটিশ ভাস্কর হেনরী মুর এবং বারবারা হেপওয়ার্থ এর প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট । বলাই বাহুল্য শিল্পী নভেরা পঞ্চাশের দশকে ইউরোপেই থাকতেন । তাঁর জন্য পৃথিবী বিখ্যাত সেই সব ভাস্করদের কাজের সান্নিধ্যে আসাটা খুব একটা কষ্ট সাধ্য বিষয় ছিলো না । যদিও বারবারা হেপওয়ার্থ কিংবা হেনরী মুরের ভাস্কর্যের ভলিউম বা ঘনত্বের সাথে নভেরার ভাস্কর্যের তেমন কোনো সাদৃশ্যতা নেই । সেখানে নভেরার ভাস্কর্যকে অনেক ক্ষেত্রে চ্যাপ্টা মনে হতে পারে । বেশীরভাগক্ষেত্রে তিনি ক্লোজড এবং অর্গানিক ফর্ম নিয়ে কাজ করতেন । পরিবারের প্রতি তাঁর যে একধরনের দূর্বলতা ছিলো সেটাও ফুটে ওঠে তাঁর কাজে ; যেমন হেনরী মুরের কাজেও দেখা যায় ।

বারবারা হেপওয়ার্থের ভাস্কর্য , ডুয়েল ফর্ম
বারবারা হেপওয়ার্থের ভাস্কর্য , ডুয়েল ফর্ম, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

শিল্পকলায় সারা পৃথিবীতে, রেনেসাঁর পরবর্তী সময়ে, ভাস্করদের থেকে চিত্রকরদের সংখ্যাই বেশী ছিলো । চিত্রকলা চর্চা ছিলো অনেক বেশী সহজ , ভাস্কর্য চর্চার থেকে । ভাস্কর্য চর্চার জন্য স্হান এবং নির্মান সরঞ্জামের যোগান একটা বিরাট চ্যালেন্জ সব সময় । সে ক্ষেত্রে ভাস্করদের সংখ্যা তুলনা মূলকভাবে কম ছিলো সারা বিশ্বে এবং নারী ভাস্করতো অবশ্যই কম । নভেরা আহমেদকে উপমহাদেশের প্রথম আধুনিক ভাস্কর বলা হয় । শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন স্যার যেমন উপমহাদেশের আধুনিক শিল্পকলার জনক । যার সূচনা হয় কবিগুরু রবিন্দ্রনাথের হাতে । কিন্তু আমাদের এই অর্জনগুলোকে আমরা সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছি । এমনকি পার্শ্ববর্তীদেশ ভারতও যখন এগিয়ে গিয়েছে তখন, আমরা দিনে দিনে পেছনের দিকে হেটে চলেছি …

সেই প্ঞ্চাশ-ষাটের দশকেই নভেরার কাজে আধুনিকতার ছোয়া দেখতে পান অনেকেই ; কিন্তু তারো বহু আগে ১৯১৭ সালে ইতিমধ্যেই ফাউন্টেন নামে একটি ফাউন্ড অবজেক্টের মাধ্যমে ফরাসী শিল্পী মার্শাল ডুশ্যাঁ কন্সেপচুয়াল শিল্পকলার যাত্রা শুরু করিয়ে দিয়েছিলেন । সে ক্ষেত্রে শিল্পকলায় আধুনিকতার শুরু আমরা ইম্প্রেশনিজম সময় থেকেই ধরে নিতে পারি । নভেরা আহমেদ সেই সময় ইউরোপে বসবাসরত ছিলেন ; আধুনিক ভাস্কর্যের চরিত্র তাঁর কাজে আরো বিলষ্ঠ ভাবে ধরা পড়বার কথা ছিলো। যখন ভাস্কর্য জগৎকে আলোকিত করছিলো, হেনরী মুর, বারবারা হেপওয়ার্থ, আলেক্সান্ডার কেল্ডার, আলবার্টো জিওকোমেত্তি, কনস্টান্টিন ব্রাঙ্কুইসি এবং আরো অনেকে । ভাস্কর রঁদ্যারও তিনি ভক্ত ছিলেন, সেটা যে কোনো ভাস্কর মাত্ররই হওয়ার কথা । ২০০৮ এবং ২০০৯ এ নির্মীত কিছু ভাস্কর্যে তিনি ভাস্কর জিওকোমেত্তির মতো অমসৃন সমতল ব্যবহার করেছেন । একজন মানুষের প্রতিকৃতি মূর্তিতে দেখা নাক, কান বিহীন যেনো পরিচয়হীন, অনুভূতিহীন কোনো মানুষ। আবদ্ধ , বিস্মৃত । যথারীতি শিল্পী পিকাসোরও প্রভাব লক্ষ্য করা যেতে পারে তাঁর ভাস্কর্যে ।

শিল্পী নভেরার ভাস্কর্য , ২০০৯
শিল্পী নভেরার ভাস্কর্য , লো ব্যারন ফু, ২০০৯, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

কলোম্বিয়ান শিল্পী ডরিস সালসেদোর এর কাজেও আমরা দেখি স্বদেশ ত্যাগের যন্ত্রণার কথা। তিনিও দেশ থেকে নির্বাসিত । অনেক শিল্পীকেই দেশ থেকে নির্বাসিত হতে হয়েছে, আরমেনিয়ান শিল্পী আর্শাইল গোর্কি ; কিন্তু তাঁদের কাজে আমরা দেখি সেই যন্ত্রণার ছাপ, যা শিল্পী নভেরার কাজে বেশ অনুপস্থিত। গোর্কির চিত্রকর্মে মা ও মাতৃভূমি ত্যাগের বেদনা সুস্পষ্ট । নভেরার প্যারিসের রেট্রোস্পেকটিভ প্রদশর্নীর চিত্রকর্মগুলোর যে অস্পষ্ট ইমেজ আমরা দেখি অর্ন্তজালে, সেখান থেকে মনে হয়; সেগুলোকে পরাবাস্তব বা ফভিজমের মতো করে অনেক উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার করা হয়েছে এবং পাখির ও ফুলের মতো অনেক অর্গানিক ফর্মকে ব্যবহা করা হয়েছে; শিল্পকলার বিষয় বস্তু নির্বাচনে । স্ফিংসও দেখা যায় তাদের মধ্যে । যেগুলোকে দেখে সুরিয়েলিস্ট শিল্পী ম্যাক্স আর্নস্ট এর চিত্রকলার অদ্ভুত সব পাখিদের ফর্মের কথা মনে হতে পারে ।

6304novera
শিল্পী নভেরার ভাস্কর্য, লা শেভ দো শাঁতেমেসল, ২০০৮, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

নভেরার স্বেচ্ছা নির্বাসনের সাথে ফরাসি ভাস্কর কামিল ক্লদেলের নির্বাসনের ইতিহাস যদিও মেলে না, তবুও তাদের মধ্যেকার ভাস্কর্যের প্রতি যে উন্মদনা আছে তাতে অনেক মিল পাওয়া যায় । তাদের জেদের মধ্যে মিল পাওয়া যায় । তাদের দুজনের জীবনের ঘটনাগুলোকে অনেক বেশী নিয়তি নির্ভর মনে হতে পারে । কামিল ক্লদেলকে আধুনিক ভাস্কর্যের একজন অগ্রদূত বলে মনে করা হয় । কামিল এবং রদ্যাঁ দুজনই শিল্পী মাইকেল্যান্জোলোকে ধারণ করেছেন তাঁদের কাজের মধ্যে । কামিলও একজন উপেক্ষিত ভাস্কর এবং রঁদ্যা যাকে ব্যবহার করে সুনাম কামিয়ে নিয়েছিলো সেই সময়ে । সেই কামিল ক্লদেলের জীবনীও কম বেদনাদায়ক ছিলো না । তিনিও তিরিশ বছর নির্বাসিত ছিলেন এক মানসিক হাসপাতালে ।

DSC_4995
শিল্পী পিকাসোর ভাস্কর্য, মোমা : নিউ ইয়র্ক আলোক চিত্র : আসমা সুলতানা

প্যারিসের রেট্রোস্পেকটিভ প্রদশর্নীর ব্রুশারে, প্রদশর্নীটির কিউরেটর প্যাট্রিক আমিন দাবী করেছেন যে, নভেরা কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন । তাঁর কাজের মধ্যে কবিগুরুর কবিতার কথা ফুটে ওঠে । নভেরা আহমেদ যে অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে জন্ম গ্রহন করেছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই । জীবনে অনেক সুযোগও তিনি পেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন সংগ্রাম কে এবং শিল্প সংগ্রমকে তিনি একটি সুনিপুন পর্যায়ে পৌঁছে নিতে ব্যার্থ হয়েছেন । কিন্তু কেনো ? তাহলে কি আমাদের উপমহাদেশের শিক্ষা ব্যাবস্থায় বিরাট কোনো ঘাটতি আজো রয়ে গেছে, সেই সময় থেকেই !

তিনি দেশকে কি মনে করতেন না, যে তাঁর কাজের মধ্যে আমরা স্বদেশ ত্যাগের বেদনার ভাষা খুঁজে পাই না। দেশকে তিনি মনে করবেন কিভাবে? ৪০ বছর তো কম সময় নয়, বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবার জন্য । কিন্তু আরো কয়েকটি প্রশ্ন আমার সাধারণ শিল্পী মনে ভেসে ওঠে সেগুলো হলো ; কেনো একজন শিল্পীকে দেশ ত্যাগ করতে হয় ? শিল্পীরা কেনো দেশত্যাগী হন ? শিল্পীরা কেনো স্বেচ্ছায় নির্বাসনে যান? দেশ কি চায় না তার প্রতিভাবান সন্তানকে জায়গা দিতে ? দেশ কি তার প্রতিভাবান সন্তানকে ফেরাতে চেয়েছে কখনও ? দেশ কি তার প্রিয় শিল্পীকে ফেরাতে চেয়েছে কোনোদিনও ? শিল্পী সমাজের ভূমিকা কতটুকুইবা ছিলো এক অভিমানী শিল্পীর অভিমান ভাঙ্গাতে ?

6302novera
শিল্পী নভেরার সৃষ্টি, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

শিল্পী এস এম সুলতানও তো ছিলেন একঘরে, কে তাঁর খোঁজ রেখেছে ! আমরা তবে কেনো নভেরা আহমেদের ব্যাপারে এখন বেশ উচ্চবাচ্য করছি; তিনি ফ্রান্সের মতো ধনীদেশের বাসিন্দা ছিলেন বলে ? সুবিধাপ্রাপ্তদের একটু তোষণ করে চলবার সংস্কৃতি আমাদের চিলকালের । আমরা তো স্বাধীনতার পর থেকে বেশ একটা লম্বা সময় পেয়েছিলাম এই ঘোলাটে ঘটনাকে একটা সমাধানের আলো দেখানোর । এবং সব পক্ষের জন্যই সেই সময়টা ছিলো নিজের অবস্থানকে পরিষ্কার করবার । যাতে করে কাউকেই সেই দোষের বোঝাগুলো বয়ে বেড়াতে না হতো । নভেরা আহমেদ কে অনেকে কিংবদন্তীয় বলে আখ্যায়িত করছেন, কিন্তু আমরা জানি না সেই শব্দের অর্থ কি? নাকি আমরা শব্দের পরে শব্দ সাজাতে পচ্ছন্দ করি। যেমন রঙের পাশে রঙ বসিয়ে আপন মনে আমরা এঁকে যাই অর্থহীন যত চিত্রকর্ম । যার কোনো অর্থ হয় না ; যার কোনো ইতিহাস হয় না । যা শুধু হয়ে ওঠে প্রাণহীন এক শরীর; শিল্প হয়ে উঠতে পারে না কখনই ! তিনি নির্বাসনে ছিলেন বলেই কি তিনি কিংবদন্তী ! হয়তো বা আমাদের কারো কারো ক্ষেত্রে কিংবদন্তী খোঁজার মানসিকতা, কাউকে আইকনিক রুপ দেবার অতিআগ্রহ অনুৎসাহিত করে দেয় সব ধরনের বিশ্লেষণ প্রচেষ্টা। সামাজিক সেই অদৃশ্য কর্তৃত্বের চাপটি হয়তো তারা অনুভব করেন এই সিদ্ধান্তে পৌছাঁতে। কোনো কোনো ব্যক্তি বিশেষকে আমরা এমন একটা বিশেষ স্থানে বসিয়ে দিতে পচ্ছন্দ করি যেখান থেকে আসলে বিভ্রমের সৃষ্টি হওয়া ছাড়া তেমন কোনো অর্জন করা সম্ভব না ।

তবে সব কিছু বিশ্লেষণ করে আমরা যেটুকু বুঝতে পারি, সেটা হলো শিল্পী নভেরা আহমেদের মৃত্যু আমাদের মাঝে কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেলো আবার …

১. কেনো একজন শিল্পীকে নির্বাসিত হতে হয় ?

এবং

২. কেনো বাংলাদেশ গুনী প্রতিভাধর মানুষকে তার যোগ্য স্থান দিতে ব্যার্থ হচ্ছে বারবার ?

উত্তরটা সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভয়ঙ্কর । রাজনীতি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রিয়তা, দলাদলি, সংকীর্নমন্যতা, আধুনিক শিক্ষারপ্রতি অনাগ্রহ শিল্পী সমাজের আটপৌরে জীবনের সঙ্গি । সেখানে কোনো সৎ প্রতিভাবানদের স্থান নেই !

কিন্তু একজন শিল্পী কি নিজের মেধা দিয়ে, শক্তি দিয়ে, সততা দিয়ে সেই যুদ্ধে জয়ী হতে পারেন না?

প্রশ্নটা  কেনো আমি নিজেকে নিজে করছি না ?

novera-3
শিল্পী নভেরার প্যারিসের প্রদশর্নীর একটি আংশিক চিত্র, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

বিধ্বংসী ভালোবাসা

জন্মদিন, মার্ক শাগাল , ১৯১৫, কার্ডবোর্ডে তৈলচিত্র
জন্মদিন, মার্ক শাগাল , ১৯১৫, কার্ডবোর্ডে তৈলচিত্র

“শুধুমাত্র ভালোবাসাতেই আমার আগ্রহ, এবং আমি সেই সব বিষয়গুলোর সংস্পর্শে আসতে পছন্দ করি যাদের সৃষ্টি ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেই”- রুশ চিত্রশিল্পী মার্ক শাগালের উক্তি । পৃথিবীর তাবৎ শিল্পীদের মনের কথাই হয়তো এটা । অন্তত আমার মনের কথা তো বটেই । ভালোবাসা ছাড়া সৃষ্টি কি সম্ভব ? কখনই সম্ভব নয় । শিল্পীদের ভালোবাসার প্রকৃতি যদিও বেশ অদ্ভুত হয়ে থাকে । তারা সব কিছুকে ভালোবাসাতে পারে, আবার হয়তো বা কোনো কিছুকেই ভালোবাসে না, কিছুটা হলেও নার্সিসিজম কাজ করে এমন ভাবাটাও অমূলক নয়। এমন এক অদ্ভুত টানাপোড়নের মধ্যে হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা যন্ত্রণা, হতাশা, কষ্ট বা না পাবার বেদনায় তিলে তিলে তারা সৃষ্টি করে যায় এক একটি শিল্পকর্ম, যেনো অদৃশ্য কোনো মাতৃ জঠরে জন্ম নিচ্ছে নিত্য নতুন শিশু ।

লেটার টু মাই আন বর্ন চাইল্ড, আসমা সুলতানা
লেটার টু মাই আন বর্ন চাইল্ড, আসমা সুলতানা, ২০১৪, মিশ্র মাধ্যম ( কাঁচ, সোনালী ম্যাট বোর্ড, ফাইন পেপার, মরা ঘাস ফড়িং, আমার চুল, সুঁচ ও সুতা )

শিল্পীরা চিরপ্রেমিক, তারা প্রেমে বুদ হয় প্রতিনিয়ত, সে প্রেম হতে পারে প্রকৃতির জন্য, মানুষের জন্য এমনকি শিল্পের জন্য ও । শিল্পীদের ভালোবাসার বা প্রেমের সেই রহস্যময় জগতটি কেমন, আমাদের হয়তো অনেকটাই অজানা । কিন্তু কোনো শিল্পীকে এবং তার শিল্পকর্মকে জানতে বা বুঝতে গেলে, তার জীবন সম্পর্কে অবশ্যই আমাদের জানতে হবে । ভালোবাসা ব্যতীত কোনো শিল্পীই, শিল্পী হয়ে উঠতে পারে না । সেদিক থেকে বিবেচনা করলে শিল্পী সত্ত্বাকে তার প্রেমিক সত্ত্বা থেকে আলাদা করে দেখার কোনো অবকাশ নেই ।

আত্মপ্রতিকৃতি, ভিনসেন্ট ভ্যান গো (গখ্/ গফ/ গগ) (১৮৫৩-১৮৯০) ১৮৮৭, বোর্ডে তৈলচিত্র
আত্মপ্রতিকৃতি, ভিনসেন্ট ভ্যান গো (গখ্/ গফ/ গগ) (১৮৫৩-১৮৯০) ১৮৮৭, বোর্ডে তৈলচিত্র

১৮৮৮ সালের ডিসেম্বরের ২৩ তারিখের এক শীতের রাত। দক্ষিন ফ্রান্সের একটি শহর আর্লস; আমরা সেই রাতের কথা জানি যখন, ডাচ শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গো একটি কাগজের মধ্যে কিছু একটা জাড়িয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তাঁর পায়ের ধাক্কায় পাথর ছিটকে পড়ছে এদিকে সেদিকে, তাঁর টালমাটাল চলার ভঙ্গি আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে সে প্রকৃতিস্থ নয় । অন্ধকারের ভেতরেও লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তাঁর কানের পাশ দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে । সে তাঁর গন্তব্যে থেমে যায় এবং একটি দরজায় ধাক্কা দেন । চিরপরিচিত সে দরজা এবং পরিচিত এক রমণী দরজা খুলে দিয়ে খুব চেনা ভঙ্গিতে তাঁকে ভেতরে আসতে বলে, শিল্পী ভিনসেন্ট সেই রমণীর হাতে তাঁর কাগজের প্যাকেটটি গুজে দিয়ে দ্রুত পায়ে ফিরে যান। অতঃপর আকাশে বাতাসে নারী কন্ঠের চিৎকার ভেসে আসে …

কানে ব্যান্ডেজ বাধা আত্মপ্রতিকৃতি, ভিনসেন্ট ভ্যান গো, ১৮৮৯
কানে ব্যান্ডেজ বাধা আত্মপ্রতিকৃতি, ভিনসেন্ট ভ্যান গো, ১৮৮৯

ভিনসেন্ট তাঁর কানের খানিকটা অংশ কেটে সেই পতিতাকে সে রাতে উপহার দিয়ে আসেন, কিন্তু ভিনসেন্ট কেনো তাঁর নিজের কান কাটতে যাবেন ? আজো আমাদের কাছে অজানা । সবাই ভালোবাসার রমণীকে ফুল উপহার দেয়, দেয় মূল্যবান কোনো বস্তু, ভিনসেন্ট কেনো নিজের কান ছিড়ে দিতে যাবেন ? কে জানে ? সে ঘটনার কোনো সুস্পষ্ট সাক্ষী বা তথ্য আমাদের জানা নেই । মনে করা হয় ভিনসেন্ট ও শিল্পী গঁগ্যা দুজনই খুব চাপা স্বভাবের ছিলেন বলে কেউ কোনো দিনো সে বিষয়ে মুখ খোলেননি। অনেকের ধারণা, হয়তো শিল্পী বন্ধু পল গগ্যাঁ’র সাথে তার তর্কবিতর্কে বা হাতাহাতির ফলে এমন দূর্ঘটনা ঘটেছিলো যে ভিনসেন্ট তাঁর কানটাকে বাঁচাতে পারেনি, অথবা হিংসা বশত নিজেই নিজের কান কেটে দিয়ে এসেছিলো সেই পতিতাকে যাকে সে পেতে চেয়েছিলো খুব আপন করে (?)। অথবা তাঁর অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণাকে ভুলতে গিয়ে, সে তাঁর শারীরিক কষ্টকে বাড়িয়ে নিতে চেয়েছিলো শতগুনে । ভিনসেন্ট একর পর এক আত্মঘাতী প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রত্যাখানের বেদনাগুলো কে ভুলতে চেয়েছিলের তার জীবদ্দশায় । যদিও সেকারণেই ১৮৮৯ সালের শুরুর দিকে আমরা উপহার পাই অসাধারণ এক শিল্পকর্ম; যার শিরোনাম ছিলো – “ কানে ব্যান্ডেজ বাধা আত্মপ্রতিকৃতি” । ভিনসেন্ট ভ্যান গো আরো একবার পৃথিবীকে জানিয়ে দিলেন, কষ্ট ছাড়া সৃষ্টি হয় না ।

শিল্পী পল গগ্যাঁ’র আঁকা ভিনসেন্ট ভ্যান গো এর প্রুতকৃতি - ‘সূর্যমুখীর শিল্পী’, ১৮৮৮
শিল্পী পল গগ্যাঁ’র আঁকা ভিনসেন্ট ভ্যান গো এর প্রুতকৃতি – ‘সূর্যমুখীর শিল্পী’, ১৮৮৮

আরো একটু অতীতের দিকে ফিরে গেলে দেখা যাবে যে, ১৮৭৫ সালে ভিনসেন্ট যখন তার চাচার লন্ডনের গুপিল গ্যালারিতে কর্মরত ছিলেন একজন সাধারণ শিল্পকর্ম বিক্রেতা হিসেবে ; তখন তিনি সেখানে উরসুলা লয়ার নামের ৫৮ বছরের বেশী বয়স্ক এক বিধবা মহিলার বাসায় লজিং থাকতেন। তিনি তাঁর ১৯ বছর বয়সি মেয়ের সাথে একটি বাচ্চাদের স্কুল পরিচালনা করতেন সেই বাড়ীতেই। ভিনসেন্ট সেই সময় উরসুলা লয়ারের কন্যা ‘ইউহেনিয়া লয়ার’র অনুরাগ প্রার্থী হন। ভিনসেন্ট জানতো না যে গোপনে ইতিমধ্যে অন্যকারো বাগদত্ত্বা হয়ে আছে, বা জানলেও ভিসেন্টের অদম্য আগ্রহ সে চাপা দিতে না পেরে, উরসুলা কন্যাকে ভালোবাসার কথা ব্যাক্ত করেন । কিন্তু হায় ! তাকে শুধু প্রত্যাখানই করা হয়না, করা হয় অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে, অপমানও করা হয় নির্মম ভাবে । যদিও ভিনসেন্ট ইউহেনিয়া কে অনুরোধ করে সেই সম্পর্ক ছিন্ন করতে তাঁর জীবনে চলে আসতে, কিন্তু তাতেও সে রাজি না হলে, ভগ্নহৃদয় ভিনসেন্ট মারাত্মক ভাবে মানসিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়েন। ফলশ্রুতিতে ভিনসেন্ট নিজেকে সবার থেকে দূরে সরিয়ে নেন, একা হয়ে পড়েন । কোনো এক পর্যায়ে তিনি ভাই থিওকে চিঠিতে লেখেন ‘আমি হয়তো সারা জীবন চিরকুমার রয়ে যাবো ’।

১৮৭৩ সালে ভিনসেন্টের আঁকা রেখাচিত্রে লন্ডন
১৮৭৩ সালে ভিনসেন্টের আঁকা রেখাচিত্রে লন্ডন

নারীজাতি শক্ত পুরুষের নিকট যতটা নমনীয় আচরন করতে পারে, ভিনসেন্টের মতো শিশুর মতো সরল একজন পুরুষের নিকট তারা ততটাই নির্মম  হয়ে উঠতে পারে ।

ইউহেনিয়া লয়ার
ইউহেনিয়া লয়ার

যদিও ছোটো ভাই থিও কে ভিনসেন্ট সব সময় চিঠি লিখেতেন কিন্তু, তাঁর ভালোবাসা বা প্রণয় বিষয়ে সে খুব কম উল্লেখ করেছে । ১৮৮১ সালের নভেম্বর মাসে, সে থিও কে লেখে “আমি একজন নারীকে চলে যেতে দিয়েছি, সে অন্যকে বিয়ে করেছে । আমি তার কথা ভোলার জন্য অনেক দূরে চলে এসেছি, ভুলতে পারিনি । বিধ্বংসী ।”— কথা গুলো থিওকে সে বলে ছিলো ক্যারোলাইনকে উদ্দেশ্য করে ।

 ভ্যান গো এর অনুজ থিও ভ্যান গো (১৮৫৭-১৮৯১) ভ্যান গো এর অনুজ থিও ভ্যান গো (১৮৫৭-১৮৯১)

যদিও মনে করা হয় ইউহেনিয়া ভিনসেন্টের প্রথম প্রেম, তবে মতান্তরে ভ্যান গো এর আগেও একজন  তরুনীর প্রেমে পড়ে বলে মনে করা হয় । তার নাম ক্যারোলাইন হানবেক । নেদারল্যান্ডের রিজউইকে তাদের সংক্ষিপ্ত এক সাক্ষাতে ভিনসেন্ট এই তরুনীর প্রেমে পড়ে যান- যাকে তিনি নাম দেন ‘সব থেকে কোমল বুনোফুল’ বলে । কিন্তু যখন জানতে পারেন তাঁরই এক জ্ঞাতিভায়ের সে বাগদত্ত্বা তখন, ভিনসেন্ট তাঁর অনুজ থিও কে বলেছিলো “আমি যদি কোনো ভালো রমণী খুঁজে না পায়, তবে খারাপই সই’- আমি একা থাকতেপারবো না, কোনো পতিতা হলেও চলবে”। যদিও ভিনসেন্ট সব সময় শারীরিক চাহিদা থেকে তাড়িত হবার চেয়ে, মানসিক আশ্রয় খুঁজতেন, খুঁজতেন সমমনা কোনো নারীকে, তার চিন্তা চেতনার সঙ্গি করতে । ক্যারোলাইনের কথা ভিনসেন্ট তাঁর চিঠিতে নানা স্থানে উল্লেখ করেছেন । এমনকি তিনি ক্যারোলাইন এবং তার স্বামী উইলেমকে ও চিঠি লিখতেন । থিওকে কোনো একটি চিঠিতে ভ্যান গো উল্লেখ করেছিলেন, অল্প বয়সের সেই প্রেম ও প্রত্যাখানের কথা, সেই প্রত্যাখানের বেদনা যে বৃথা যায়নি সেটাও তিনি নিশ্চিত করেছেন । ভিনসেন্টের সাহসী সব পদক্ষেপ এবং জীবনকে ঝুকির মধ্যে ঠেলে দিয়েও তিনি তার সৃষ্টিকে রেখেছিলেন সচল, জীবনের সব ব্যার্থতা কে পিছনে ফেলে তিনি শিল্পকে আপন করে নিয়েছিলেন ।

স্টারি নাইট, ভিনসেন্ট ভ্যান গো, ১৮৮৯,  মোমা , আমেরিকা, আলোকচিত্র: আসমা সুলতানা
স্টারি নাইট, ভিনসেন্ট ভ্যান গো, ১৮৮৯, মোমা , আমেরিকা, আলোকচিত্র: আসমা সুলতানা

ইউহেনিয়া লয়ারের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এবং মানসিকভাবে বিভ্রন্ত ভবিষ্যৎ শিল্পী যখন হল্যান্ডে ফিরে যান তখন, তার জ্ঞাতিবোন কি ভসে’র প্রেমে পড়েন আবার । ১৮৮১ সালের অগাস্ট মাসে কি ভসে সদ্য বিধবা হয়ে ঘরে ফিরেছেন তার পুত্রকে নিয়ে । এবং ভিনসেন্ট প্রেমে ব্যার্থ হয়ে পুনরায় জীবনে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। তিনি তাঁর জ্ঞাতিবোন কি ভসে কে প্রেম নিবেদন করলেন এই বলে যে; ‘আমি তোমাকে ততটুকুই ভালোবাসি যতটুকু নিজেকে’-‘তুমি কি আমাকে বিয়ে করার ঝুকি নেবে’? স্বাভাবিক ভাবেই পারিবারিকভাবে বাধা আসে । কারণ, উনবিংশ শতাব্দীতে হল্যান্ডে চাচাতো-মামাতো ভাই বোনের মধ্য বৈবাহিক সম্পর্ক হওয়াকে নিষিদ্ধ বলে গন্য করা হতো । কি এর বাবা তার মেয়ের সাথে ভিনসেন্ট কে দেখা করতে না দেয়ায়, তাঁর ধারণা হলো যে, মেয়ের বিরুদ্ধে তিনি কাজ টা করছেন বলে ভিনসেন্ট জোর করে, কি এর সাথে দেখা করতে চান একদিন এবং একটি জ্বলন্ত মোমবাতির শিখায় হাত রেখে বলেন “ আমাকে ওর সাথে দেখা করতে দাও, তা না হলে আমি আমার হাত সরাবো না এই আগুন থেকে ”।

ভিনসেন্টের জ্ঞাতিবোন কি ভসে ও তার পুত্র, ১৮৮০
ভিনসেন্টের জ্ঞাতিবোন কি ভসে ও তার পুত্র, ১৮৮০

কিন্তু হায়, নিয়তি যাখন ঠিক করে রেখেছে তাঁর ভাগ্যে ভালোবাসা জুটবে না, কোনোদিনো । নিয়তিকে কে খন্ডাতে পারে ? কি ভসে আবারো নির্মম ভাবে এই ক্ষেপাটে শিল্পীকে প্রত্যাখান করেছিলো । এবং চিৎকার করে বলেছিলো ‘না , নাহ, কখনই না !’

শিল্পীভ্যান গো কে কোনো নারী সঠিকভাবে চিনতে পারেনি সেদিন । কারণ সময়ের আগে জন্ম নেয়া প্রতিভাধর মানুষকে বোঝার ক্ষমতা, তার সমসাময়িকদের মধ্যে থাকে না । তবে আর ভিনসেন্টের মৃত্যুর শত বছর পরেও তিনি হয়েছেন শত শত রমণীর প্রেরণা ও ভালোবাসার কেন্দ্র । সেই অর্জন গুটি কয়েক সাধারণ রমণীর ভালোকবাসা পাবার থেকে শত গুনে বেশী ।

‘সূর্যমুখ’
সূর্যমুখী, ভিনসেন্ট ভ্যান গো, ১৮৮৮

ভিনসেন্টকে মনে করা হতো, শিশু সুলভ একজন মানুষ, যে সমাজের বাকি দশজন মানুষের মতো চিন্তা করতে জানেতা না, যার কোনো বৈষয়িক জ্ঞান ছিলো না, লোভ বা লালসা কোনোটাই তাঁর ছিলো না । সে মানুষকে চিনতে বা বুঝতে পারতো না সঠিক ভাবে । থিও কে সে একবার চিঠিতে লিখেছিলো যে “সম্পর্কতো শুধু নেবার জন্য নয় দেবার জন্যও” । ভিনসেন্ট সব সময় সব ক্ষেত্রে নিজেকে উজাড় করে দিতে চেয়েছিলেন । তাঁর সাথে কয়েকজন পেশাদারী পতিতার সম্পর্কের কথাও জানা যায় । তাদের মধ্যে সিন হুরনিকের নাম সব থেকে পরিচিত । ১৮৮১-১৮৮৩ সালের মধ্যেকার ঘটনা । ভিনসেন্ট ভ্যান গো এর অনেক শিল্পকর্মে আমরা সিন হুরনিক কে দেখতে পাই । তিনি তার কাজের মডেল হিসেবে তাকে ব্যবহার করেছেন । সিন হুরনিক তখন অন্তসত্বা ছিলো, এক পর্যায়ে ভিনসেন্ট সিন হুরনিক এর সাথে এক সাথে বসবাস শুরু করেন । পরবর্তিতে সিন হুরনিক এর একটি পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে এবং আমরা সেই শিশুটিকেও ভিনসেন্টের কাজে দেখতে পাই । পাগলাটে শিল্পী পরিবার ও সমাজের বিরুদ্ধে গিয়েও  সেই শিশু এবং তার পাঁচ বছরের একটি বোন সহই সিনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, অবশেষে ভাই থিও এর অনুরোধে সে সিন হুরনিককে পরিত্যাগ করে; একি সথে অবসান হয় ভিসেন্টে একমাত্র সংক্ষিপ্ত সংসার জীবনের ।“ হ্যা আমি একটা বেশ্যা ! – আমার সাথে জীবন কাটানো আর নদীতে ঝাপ দেয়া একি কথা ।” বলেছিলো সিন হুরনিক ভিনসেন্ট কে ।

ভিনসেন্টের আঁকা রেখা চিত্র, ‘দু:খ’ সিন হুরনিককে  (১৮৫০-১৯০৪)তিনি মডেল হিসেবে ব্যাবহার করেছেন, মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট, নিউ ইয়র্ক, আলোকচিত্র : আসমা সুলতানা
ভিনসেন্টের আঁকা রেখা চিত্র, ‘দু:খ’ সিন হুরনিককে (১৮৫০-১৯০৪)তিনি মডেল হিসেবে ব্যাবহার করেছেন, মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট, নিউ ইয়র্ক, আলোকচিত্র : আসমা সুলতানা

ধীরে ধীরে ভিনসেন্ট নিজ ভাগ্যের মানচিত্রটা পড়তে পেরে, মেনে নিতে বাধ্য হন যে নারী জাতির মন যখন ঈশ্বরও বুঝতে পারেনি তখন সে আর বৃথা চেষ্টা না করে, মনোযোগ দিতে শুরু করেন পড়াশুনা ও শিল্পচর্চাতে । যাযাবরের মতো ঘুরে দেখতে থাকেন চারপাশের জগতটাকে। নিজেকে সম্পূর্ণরুপে সমর্পণ করেন প্রকৃতির কাছে । এবং শিল্পের কাছেও আত্ম সমর্পণ করেন তিনি। অতঃপর মাত্র দশ বছরের অবিরাম চেষ্টায় তিনি নিজেকে বিশ্বের প্রথম সারির শিল্পীদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন । তাঁর সৃষ্ট ‘সূর্যমুখী’ বিশ্বের সবথেকে জনপ্রিয় শিল্পকর্ম  বলে বিবেচিত আজকের দিনে ।

ভিনসেন্ট এর আঁকা তার মায়ের প্রতিকৃতি, ১৮৮৮, ক্যানভানে তৈলচিত্র
ভিনসেন্ট এর আঁকা তাঁর মায়ের প্রতিকৃতি, ১৮৮৮, ক্যানভানে তৈলচিত্র

শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গো কেনো পাগলের মতো রমণীদের ভালোবাসা পাবার জন্য ছুটেছেন? কেনোইবা তিনি হাহাকার করতেন, কোনো কোমলমতি নারীর স্পর্শের জন্য । খুব সংক্ষিপ্ত করে বললে বলতে হবে, শৈশব থেকে ভিনসেন্ট ছিলেন মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত । ভিনসেন্ট এর জন্মের ঠিক এক বছর আগে তাঁর এক ভায়ের জন্ম হয়েছিলো এবং সে শিশু অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে । তার নামও ছিলো ভিনসেন্ট। এ কথা জানার পর থেকেই ভিনসেন্ট নিজেকে, মনে মনে দায়ী করতেন সে ঘটনার জন্য। শুধু তাই নয়, ভিনসেন্ট তাঁর মায়ের কাছ থেকে কোনো স্নেহ বা ভালোবাসা না পেয়ে ধীরে ধীরে দূরে সরে আসেন । এবং আমৃত্যু তিনি একটি কথাই বোঝার চেষ্টা করেন সেটা হলো, কেনো তাঁর মা, তাঁর শিল্পকর্মকে ‘দু:সহনীয়’ বলেছিলো এবং কোনো দিনো কোনো প্রশংসা করেননি। ভিনসেন্ট ভ্যান গো এর সাথে তাঁর মায়ের সম্পর্কের দূরত্ব ছিলো সারাটি জীবন; তাই ভিনসেন্ট রমণীর ভালোবাসা, মমতা, স্নেহ, আদর পাবার জন্য ব্যাকুল ছিলেন । ভিনসেন্ট এর আয়ু মাত্র ৩৭ বছর হলে কি হবে, তাঁর মা তিন পুত্র সন্তানের অকাল মৃত্যুর পরেও দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন ।

জোয়ানা ভ্যান গো (১৮৬২-১৯২৫)এবং তার শিশু পুত্র উইলিয়াম
জোয়ানা ভ্যান গো (১৮৬২-১৯২৫)এবং তার শিশু পুত্র উইলিয়াম

যে নারীটির অবদানের কথা না বললে অসম্পূর্ন থেকে যাবে সে হলো – জোয়ানা ভ্যান গো । ভিনসেন্টের ছোটো ভাই থিও ভ্যান গো এর স্ত্রী ও সন্তানের মা । জোয়ানার সঙ্গে ভিনসেন্টে এর সম্পর্কের ব্যাপ্তি খুব সংক্ষিপ্ত কালের । কিন্তু এর স্থায়িত্ব আজীবনের । জোয়ানা যদিও ছিলেন তাঁর ছোটো ভাই এর স্ত্রী, তবুও ভিনসেন্টের সাথে ছিলো তার বন্ধুর মতো সম্পর্ক । এক পর্যায়ে জোয়ানাই নেন ভিনসেন্টে এর মায়ের স্থান, বোনের স্থান বা সহধর্মিনীর স্থান । জোয়ানা তার শিশু পুত্রকে বুকে নিয়ে, ভিনসেন্টের শিল্পকর্ম আকড়ে ধরে, থিও ও ভিনসেন্টে এর চিঠি পত্রগুলোকে আগলে রেখে সামনে এগিয়ে গেছেন এবং ভিনসেন্টের মৃত্যুর ১৬ বছর পরেও হলে তাকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করেই তবে ক্ষান্ত হয়েছেন । যে সব রমণীরা ভিনসেন্টে ফিরিয়ে দিয়ে নারী জাতির কলঙ্ক হয়ে রয়ে গিয়েছিলো, জোয়ানা এক হাতে সেই দাগ মুছে দিয়েছিলেন । আর শিল্পকলার জগতের আকাশে আমাদের উপহার দিয়েছেন একটা উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ।

তারপরেও ভালোবাসা বেঁচে থাকে । শিল্পীরা প্রেমে পড়ে, সৃষ্টি করে অনবদ্য সব সৃষ্টিকর্ম । মানব বা মানবীর প্রতি প্রেম শিল্পীর জীবন কে লন্ডভন্ড করে দিলেও সৃষ্টির প্রশ্নে ও সৃজনশীল চর্চায় সে থাকে অনঢ় এবং অবিচল । আত্মসমর্পণে শিল্পী নিজেকে ভাসিয়ে দেয় না সমাজ সংসারের চিরয়াত সংস্কারের মাঝে । সে ভেসে চলে ভিন্ন স্রোতে । একা। বিচ্ছিন্ন ভাবে । তার চলার সঙ্গি তার হৃদয় মাঝে বয়ে চলা ভালোবাসার ঝর্নাধারা । ভালোবাসা ও প্রেমই তার সৃষ্টিশীলতার চালিকা শক্তি । ভিনসেন্ট ভ্যান গো যেমনটি বলেছিলেন – “ অনেক কিছুকে একসঙ্গে ভালোবাসা ভালো, ভালোবাসার মধ্যেই শক্তি লুকিয়ে থাকে, যে বেশী ভালোবাসতে জানে সে বেশী পরিশ্রম করতে পারে এবং বেশী অর্জন করতে পারে এবং ভালোবাসায় যে কাজ করা হয় তা হয় সর্ব শ্রেষ্ঠ’’।

রনের উপরে নক্ষত্র রাত, ১৮৮৮, ক্যানভাসে তৈলচিত্র
রনের উপরে নক্ষত্র রাত, ১৮৮৮, ক্যানভাসে তৈলচিত্র

(চলবে…)