শেকড়হীন স্মৃতির নি:শব্দ আর্তনাদ

3863235739_b158a2a296

Colombia is a country full of widows.There was one widow, the widow of a political leader, who told me how difficultit was to continue living with objects that are reminders of her husband. Everymorning you open the closet and the clothing is there. Every day you sit at thedining table and the empty chair is there, screaming the absence of thatperson. It can become a very difficult object to live with.—Doris Salcedo

সমসাময়িক শিল্পকলার জগতে, বিশেষ করে ভার্স্কয ও স্হাপনা শিল্পের মতো বেশ র্দুলভ সৃষ্টিশীল শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে, কলোম্বিয়ান শিল্পী ডরিস সালসেদোর নাম উঠে আসে বিশেষ গুরুত্বের সাথে । শিল্পী ডরিস সালসেদোর শিল্পকর্ম রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবিত (Political Art ) শিল্প বলে সংজ্ঞায়িত করা হলেও, তাঁর শিল্পকর্মে ব্যক্তিগত জীবন, আর সেই জীবনের সীমানা পেরিয়ে ল্যাটিন আমেরিকার সামরিক একনায়কতন্ত্রগুলোর গণতন্ত্রহীনতা ও মানবাধিকারহীনতার সেই কৃষ্ণ অধ্যায়ের সমষ্ঠিগত অভিজ্ঞতার বিভীষিকাময় স্মৃতির বলিষ্ঠ প্রকাশ, সে কাজগুলো যতটা না রাজনৈতিক অভিক্ষেপ, তারচেয়েও অনেক বেশী নিপীড়িত মানুষের বিস্মরনের বিরুদ্ধে স্মৃতির সংগ্রাম, জমাট বাধা নি:শব্দ আর্তনাদ যা সময়ের শরীরের আচড় কেটে জানান দেয় দু:শাসনের বিরুদ্ধে মানবতার নিরন্তর সংগ্রামকে।

ল্যাটিন আমেরিকার দেশ কলোম্বিয়া তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ও কর্ম জীবন । শিক্ষা জীবনের শেষ ধাপ স্নাতোকত্তর ডিগ্রির জন্য আমেরিকা পাড়ি জমালেও , শিক্ষা শেষে ফিরে যান নিজ জন্মভুমিতে ও শিক্ষকতা শুরু করেন সেখানে। তাঁর স্বদেশে , যেখানে সামরিক শাসনের বিভীষিকা তছনছ করে দিয়েছিলো সাধারণ মানুষের জীবন, শোষক গোষ্ঠির নির্যাতনের শিকার হয় সাধারন মানুষ। ভুলুণ্ঠিত মানবাধিকার আর গণতন্ত্রহীনতার অন্ধকারে মানুষের হাহাকার প্রতিধ্বনিত হতে থাকে অসহায় জীবনের দেয়ালে দেয়ালে । শিল্পী ডরিস নিজের ও তাঁর বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনকে হারিয়েছেন সেই দু:স্বপ্নসম গ্রহনকালে, দেখেছেন প্রিয়জনদের দূর্ভোগ। পরবর্তীতে সেই সব অভিজ্ঞতা লব্ধ স্মৃতিকথন তাঁর নান্দনিক স্পর্শে , তাঁর সৃষ্টি শিল্পকর্মের মাধ্যমে অভিব্যক্ত হতে থাকে । আজো হচ্ছে . . .

১৯৫৮ সালে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ কলোম্বিয়াতে জন্ম গ্রহনকারি এই শিল্পী লন্ডনের টেট মর্ডানের ৮ম আমন্ত্রিত শিল্পী যিনি তাঁর শিল্পকর্ম সেখানে প্রর্দশন করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। আমার ডরিস সালসেদোর শিল্পকর্ম দেখাবার সুযোগ হয়েছিলো প্রথম, লন্ডনের টেট মর্ডানের গ্যালারীর ছাই রঙা হিম শীতল একটি কক্ষের মধ্যে। সেই শিল্পকর্মটি আমার মনে এত গভীরভাবে দাগ কেটেছিলো যে , আমি সহজেই অনুধাবন করতে পেরেছিলাম তাঁর শিল্পকর্মের মর্মকথা । আমি যেনো নিজেকে দেখতে পেলাম সেই সিমেন্ট-কাঠের আয়নায় ।

শিল্পকর্মটি ছিলো একটা ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্য । একটা কাঠের আলমারিকে, সিমেন্ট দিয়ে লেপে অনেক খানি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ; তবুও তার কাঠের শরীরের অবয়ব দৃশ্যমান । দেখে যেনো মনে হয় একটা কফিন কে খাড়া করে দাড় করিয়ে দিলে যেমন হবে । যে কফিনটাকে খোলা যাবে না আর কোনো দিনো । হয়তো সেখানে শুয়ে আছে মৃত কোনো শরীর । যে শরীরটা একদিন জীবন্তু ছিলো । ছিলো প্রানবন্ত , বাঙ্ময় । আজ আর সে কথা বলবে না । সে তার ভেতরে সমস্ত স্মৃতি নিয়ে শুয়ে আছে কফিনের মধ্যে । সে নিজে আজ হয়ে গেছে স্মৃতি । জমে গেছে কালের গভীরে শীলা খন্ডের মতো ।

salcedo_50090-95_055

অতীত রয়ে যায় পিছে, অতীত স্মৃতি হয়ে যায়, স্মৃতিও জমে হয়ে যায় পাথর একদিন …শিল্পী ডরিস সালসেদোর সৃষ্টিকে যত দেখেছি তত হয়েছি মুগ্ধ, যত জেনেছি তত হয়েছি বিস্মিত । শিল্পিী ডরিস সালসেদোর কাজ সমসাময়িক শিল্পকলার পরিমন্ডলে অত্যন্ত সমাদৃত ও স্বতন্ত্র । বিভিন্ন আটপৌড়ে আসবাবকে জোড়াতালি দিয়ে তিনি গড়ে তোলেন তাঁর ভাস্কর্য স্বরুপ শিল্পকর্ম গুলো । টেবিলের সঙেগ খাট জোড়া দিয়ে , আলমারির সঙ্গে বেইয়ের তাক অথবা কিছুটা অংশ পুড়িয়ে বা মাটি ও সিমেন্ট লেপে তিনি বদলে ফেলেন মূল আসবাবটির চরিত্র। বেন্চ এর উপর বেন্চ বসিয়ে , মাঝে মাটির স্তরে বেড়ে উঠতে দেন ঘাসের চারা। শিশুদের দোলনাকে মুড়ে দেন দড়িতে বোনা জালের ভেতরে …এমন অভিনব চিন্তা ও তাঁর প্রকাশ ও অভিব্যাক্তি অনবদ্য । তার শিল্পকর্ম দেখলে মনে হয় মানুষের বুকের ভেতরের হাহাকার , তাঁর হাতের স্পর্শে সৃষ্ট শিল্প একাকার হয়ে যায় ….. শিল্পী ডরিস সালসেদো শিল্প সৃষ্টির প্রক্রিয়াতে বেশী সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠেন ; তিনি সেই সব আসবাবপত্রে মানুষের চুল, দাঁত বা হাড় চামড়াকে বসিয়ে দেন সুনিপুন ভাবে । ছিড়ে যাওয়া কাপড়ের অংশ, পোষাকের লেস কে এমন ভাবে তিনি স্হাপন করেন স্হাপনা শিল্পে যে মনে হয় এটাই আসবাবটার অংশ। সেই টুকরো কাপড়টুকু বলে যায় হাজারো কথা যেনো । এভাবেই নানা শিল্প প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে শিল্পী তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে মানুষের ফেলে আসা অতীতকে দেখাতে চান ।

Doris_Salcedo_1

যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশ বা রাজনৈতিক ভাবে অস্হির দেশে মানুষ কে মুখোমুখি হতে হয় নানা ধরনের তিক্ততার বা বিভীষিকার । নিজেদের স্হায়ী ঘরবাড়ি ফেলে, পালাতে হয় নিরুদ্দেশে বা নিজেদের ঘরেই হতে হয় নির্যাতনের শিকার । নিজেদের আবাস কারো কারো জন্য হয় সমাধি স্হল বা কবরস্হান । সেই রাজনৈতিক অস্হিরতায় সাধারণ মানুষকে নিজেদের চিরচেনা প্রিয় সংসার আসবাব ফেলে পা বাড়াতে হয় অন্ধকারের দিকে । পেছনে রয়ে যায় কত স্মৃতি , কত বেদনা কত কষ্টের ইতিহাস । জমে জেম যা হয় শুধুই স্মৃতির স্তুপ ।

শিল্পী ডরিস সালসেদোকে তাঁর কাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে , তিনি এক শব্দে বলবেন ’স্মৃতি ’ বা ’মেমোরী ’; আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলবো ৭১ এর স্মৃতিকথা ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s