নীল দর্পনে ধূসর আত্মপ্রতিকৃতি: শিল্পী ফ্রিদা কাহলোকে জন্মদিনের শ্রদ্ধা

২০০৫ সালে লন্ডনের টেট মর্ডান গ্যালারিতে ফ্রিদা কাহলোর প্রদর্শনীতে আমি

শিল্পকলার  জগতের সাথে যদি মহাবিশ্বর তুলনা  করি, তাহলে সেই  জগতের  লুব্ধক হবে শিল্পী  ফ্রিদা কাহলো। কারণ তাঁর সৃষ্ট শিল্পকর্মের চেয়েও শৈল্পিক  তাঁর যাপিত জীবন এবং  দু:স্বপ্নের থেকেও পরাবাস্তব।  ১৯০৭  সালের ৬ জুলাই মেক্সিকোতে জন্মগ্রহন করেন শিল্পী ফ্রিদা কাহলো। স্বপ্ন দেখেন প্যারামেডিকেল পড়ে চিকিৎসক হবেন।  মাত্র আঠারো বছর বয়সে  এক সড়ক দূর্ঘটনায় ঘুরে যায় তাঁর জীবনের মোড়। মেরুদন্ডে তিনটা ভাঙ্গনসহ ক্ষতবিক্ষত হয় কিশোরী শরীর। লোহার  রডে ছিন্ন বিছিন্ন হয়ে যায় তলপেটের নীচের অংশ, জরায়ু হয় এফোড় ওফোড়। সন্তান ধারণ করা সম্ভব হয়নি আর কোনো দিনো। পরর্বতীতে তিন বারের বেশী গর্ভপাতে ফ্রিদা ভেঙ্গে যান শত গুনে। তিরিশবার অস্ত্রপচারেও তাঁকে এত ব্যাথিত  ও দূর্বল করতে পারেনি যতটা করেছে  তাঁর গর্ভের ভ্রুন নষ্ট হওয়াতে। সেই মারাত্মক র্দূঘটনার পরেও অত্যন্ত অলৌকিক ভাবে বেঁচে যান শিল্পী ফ্রিদা কাহলো। ক্রমান্বয়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক বিপর্যস্ততা তাঁকে করে তোলে দৃঢ়চিত্তের অধিকারী, মৃত্যু অবধারিত জেনেও লড়তে থাকেন আজীবন সংশপ্তকের মত।

ফ্রিদা কাহলোর আঁকা আত্মপ্রতিকৃতি

সেই দূর্ঘটনার পর  দীর্ঘ নয়মাস একটানা ফ্রিদাকে হাসপাতালে  থাকতে হয়। যদিও এরপরে জীবনের বিভিন্ন  সময়ের বেশীর ভাগটাই কেটেছে তাঁর হাসপাতালের বিছানায় অথবা হুইলচেয়ারে। এই নয় মাসে তাঁর করার কিছুই ছিলো না তেমন।   চঞ্চলমতি মেয়ে  ছিলো ফ্রিদা। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদেয়া সম্ভব না হওয়ায়।  ফ্রিদা হাতে তুলে নেন রঙ তুলি। বাবা-মা তাকে বানিয়ে দেন কাঠের ইজেল, এমনকি হাসপাতালে শুয়ে ছবি আঁকার  মত সকল ব্যবস্হাও করে দেন। সেই থেকে শুরু তাঁর শিল্পী জীবনের পথ চলার। ফ্রিদা কাহলো জীবনের শেষ দিনটি পযর্ন্ত ধারাবাহিকভাবে,  এঁকে গেছেন তার জীবনের যন্ত্রনার  মহাকাব্য পরাবাস্তব ভঙ্গিমায়।

স্বামী দিয়েগো রিভেরার সাথে ফ্রিদা কাহলো

ফরাসী লেখক ও শিল্প সমালোচক আঁন্দ্রে ব্রেতোঁ শিল্পী ফ্রিদার প্রতিভাকে চিনতে ভুল করেননি। আঁন্দ্রে ব্রেতোঁর সহযোগিতায় অল্প সময়ের মধ্যেই, তাঁর প্রথম চিত্র প্রদশর্নীর পরে ফ্রিদা বেশ জনপ্রিয় হয়ে  ওঠেন নিউইয়র্কে।  তবে ফ্রিদা কে সারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রধান কৃতিত্ব তাঁর স্বামী শিল্পী দিয়েগো রিভেরার। দিয়েগো ছিলেন মেক্সিকোর সমকালীন প্রখ্যাত দেয়াল চিত্র শিল্পী ও মেক্সিকোর কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক ও নান্দনিক জগতে সমান ভাবে তিনি সঙ্গ দিয়েছেন স্ত্রী ফ্রিদাকে। যদিও ফ্রিদা কাহলোর জীবনের মানসিক যন্ত্রনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলো দিয়েগোর বহুগামিতা। যা মৃত্যু অবধি ফ্রিদাকে  যন্ত্রনা দগ্ধ প্রেমিকার মূর্তিতে করেছে আসীন,  এমকি তাঁকে দিয়েছে সীমাহীন দিগন্তের  এক শিল্পী হয়ে বেড়ে উঠবার তাড়না।

নিজের শিল্পকর্মের সামনে ফ্রিদা কাহলো

দিয়েগো  রিভেরায়ই ফ্রিদাকে সেই মর্যাদা দিয়ে গিয়েছেন যা ছিলো  তাঁর প্রাপ্য।  আজ সারা বিশ্বে শিল্পী ফ্রিদা কাহলোর নাম আর যে কোন প্রথম সারির পাঁচ  জন  শিল্পীর সাথে উঠে আসে। শিল্পী ফ্রিদা ছিলেন স্বশিক্ষিত শিল্পী  ও শিল্পকলার ইতিহাসে এমন এক নাম যাকে স্মরণ করি আমরা এক অনন্য শিল্পী হিসেবে যিনি নিজের জীবনকেই করেছেন শিল্পকর্মের বিষয় বস্তু। এবং সামগ্রিকভাবে তো বটেই নারী শিল্পী হিসেবেও তিনি এক ও অনন্য। শিল্পকলার ইতিহাসে কোনো নারী শিল্পী এমন সাহসীকতার সাথে এত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কাজ করেননি। নিজের গর্ভপাতের যন্ত্রনা কাতর অভিজ্ঞতাকে বর্ননা করে যায়নি নিজের শিল্পকর্মে।

মেক্সিকোর সমসায়িক সময়ে শিল্পী  ফ্রিদা ছিলেন আধুনিক ও অনেকের চেয়েই অনেক দিক থেকে এগিয়ে। স্বামী দিয়েগোর এপিক সাইজ দেয়াল চিত্রের মডেল হয়েছেন তিনি। ছিলেন অনেক অলোকচিত্রীর অনুপ্রেরণা ও বিষয়। এদেঁর মধ্যে নিকোলাস মারের কথা উল্লেখযোগ্য। মেস্কিকোর মধ্যে শিল্পী ফ্রিদা কাহলোর শিল্পকর্মকেই প্রথমে স্হান দেয়া হয় প্যারিসের ল্যুভ মিউজিয়ামে। তিনি ’ভোগ’ পত্রিকার প্রচ্ছদ কন্যাও হয়েছিলেন তাঁর ফ্যাশন সচেতনার দরুন। আর বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রুশ বিপ্লবী লিওন ট্রটস্কির সঙ্গে ফ্রিদার সংক্ষিপ্ত প্রনয় তো সাহসিকতার দাবীদার। শিল্পী জর্জিও ওকিফের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতাও অনেকের অলোচ্য বিষয়। সর্বপরি তাঁর কাজের মাধ্যমেই আমরা তাঁর সাহসীকতার পরিচয় পায়। বোঝার উপায় থাকে না তিনি এমনভাবে ভাঙ্গাচোরা একজন মানুষ ছিলেন। তার মানোসিক দৃঢ়তা প্রশংসার দাবীদার।

ফ্রিদা কাহলোর ‍আঁকা দি লিটল ডিয়ার (The Little Deer. 1946 Oil on masonite. 22.5 x 30 cm. Private collection)

শিল্পী ফ্রিদা কাহলোর যুদ্ধময় জীবন ও তাঁর অসাধারণ শিল্পকর্মগুলো আমার সারা জীবনের প্রেরণা হয়ে আছে। ২০০৫ এর বসন্তে আমি যখন প্রথম ফ্রিদা কাহলোর অলোকচিত্রের প্রতিকৃতি দেখি, লন্ডনের ন্যাশনাল প্রোট্রেট গ্যালারীতে। আমার ফ্রিদা সম্পর্কে আগ্রহ বেড়ে যায় শতগুনে। হলিউডের ফিল্ম ‘ফ্রিদা’ দেখার পর যেমন আরো জানতে  আগ্রহী হই এই অসাধারণ শিল্পী সম্পর্কে।  কেননা আমি অজান্তেই ফ্রিদা কাহলোর মতো কাজ করতে আরম্ভ করি কোনো এক সময় থেকে।  সেই সাদৃশ্য থেকে খুঁজতে শুরু করি উৎস্য। আমাদের অভিজ্ঞতাগুলোকে অমিল বলে অস্বীকার করা যায় না সহজেই। ঠিক একি বছরের গ্রীষ্মকালে যে দেখা পাবো সামগ্রিক ফ্রিদার স্বপ্নেও  ভাবিনি। লন্ডনের টেট মর্ডান গ্যালারি, ‍আয়োজন করে শেষ পর্যন্ত সেই প্রদর্শনী যা ফ্রিদা বেঁচে থাকা অবস্হায় হওয়ার কথা ছিলো। সেই প্রদশর্নী ফ্রিদা কাহলোর মৃত্যুর ৫১ বছর পরে অত্যন্ত সফল ভাবে শেষ হলো ।

ফ্রিদা কাহলোর প্রায় সব শিল্পকর্ম ও প্রামান্যচিত্র সহ তিন মাস ব্যাপি  এই প্রদর্শনীতে উপচে পড়া ভীড় দেখে অনুমান করা যায়। শিল্প রসিকরা কিভাবে অধীর আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করে ছিলেন ফ্রিদার জন্য এই থেমসের পাড়ে এক প্রাচীন শহরে।

শিল্পী ফ্রিদা কাহলোর আঁকা : দি টু ফ্রিদা  ( 1939, Oil on canvas, 67″ x 67″, Collection of the Museo de Arte Moderno, Mexico City )

ফ্রিদার শিল্পকর্ম অর্থই তাঁর অত্মপ্রতিকৃতি যা আজ জগত বিখ্যাত। সে গুলো ছাড়াও ভূদৃশ্য, জড়জীবন বা দিনপন্জিতে আঁকা শিল্পীর খসড়া চিত্রও স্হান পায় এই বিশেষ প্রদশর্নীতে । যে গুলো স্হায়ীভাবে সংরক্ষিত   আছে   ফ্রিদা কাহলোর পৈত্রিক বাড়ী ‘ব্লু  হাউসে’। যেখানে ফ্রিদা কাহলোর জন্ম ও স্বামী দিয়েগোর সাথে বসবাস, শেষ পর্যন্ত শেষ যাত্রাও এখান থেকেই। তাই স্বামী দিয়েগো রিভেরার ইচ্ছা অনুযায়ী এই ব্লু হাউসকে রুপান্তরিত করা হয় ফ্রিদা কাহলো মিউজিয়ামে।

এই বাড়ীতে শিল্পী শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন ১৯৫৪ সালের ১৩  জুলাইতে, তাঁর জন্মদিনের ঠিক সপ্তাহ খানেক পরে। যদিও জন্ম নিবন্ধনে আছে ফ্রিদা কাহলোর জন্ম, ৬ জুলাই ১৯০৭ কিন্ত‍ু ফ্রিদা কাহলো নিজের জন্ম তারিখ ৭ জুলাই ১৯১০ দিতে পছন্দ  করতেন কারণ মেক্সিকান রেভ্যুলিউশন এই সালেই ঘটে। আজ আমরা তাকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই তাঁর জন্মদিনের, যিনি  শুধুই একজন রাজনৈতিক কমরেড ছিলেন না, জীবন যুদ্ধেও ছিলেন  সাহসী কমরেড।

কেনো জানি আমিও আমার নি:সঙ্গ মুহূর্তগুলোতে, ঠিক ফ্রিদা কাহলোর মতো মনে মনে আওড়াই “আশাকরি মৃত্যুটা আনন্দের হবে, আমি আর কখনোই ফিরে আসার প্রত্যাশা করিনা ”…

ফ্রিদা কাহলোর ‍আঁকা দি ব্রোকেন কলাম (1944, oil on canvas, Museo Dolores Olmedo, Mexico)

 

জুলাই ২০১১, টরোন্টো

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s