Ways of Seeing

‘Boi Mela’, the word stands for ‘book fair’ in Bengali (Bangla), our mother tongue. It is more correctly known as ‘Ekushey Book Fair’ or ‘Amar Ekushe Grantha Melā’ (Bengali: অমর একুশে গ্রন্থ মেলা [ɔmɔr ekuʃe grɔnt̪ʰɔ mæla] Lit. “Book Fair of immortals of the 21st [of February]”). It is the national book fair of Bangladesh which is arranged each year by the Bangla Academy and take place for whole month of February in Dhaka. The book fair is dedicated to the ultimate sacrifices made by the Bangladeshi people on 21 February 1952 in a demonstration calling for the establishment of Bengali as one of the state languages of former united Pakistan. Bangladesh later emerge as an independent nation in 1971. The day 21 February is officially known as ভাষা আন্দোলন দিবস (Bhasha Andolôn Dibôs) (also শহীদ দিবস (Shôhid Dibôs)). And from 17 November 1999, UNESCO declared the day as International Mother Language Day to promote awareness of linguistic and cultural diversity and multilingualism.

This year Boi Mela has a different dimension for me. I am happy to announce the publication of my first book. It is a Bengali translation of very important art criticism book by John Berger, Ways of Seeing. I obtained the permission from original author to publish this book. It is published by Onarjo Publications, soon to be available in their stall no 297-298. I hope this book will made a contribution to our art criticism education in Bangla as well as meet the need of curious readers who wants know how art could impact every facet of our livesWOS_book_2015_for_blog

এবারের বইমেলায় দুটি বই…

Originally posted on জীবনের বিজ্ঞান :

এবারের বই মেলায় দুটি বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, প্রকাশ করছে অনার্য প্রকাশনী, এটাই বই প্রকাশনার জগতে আমার এবং আসমা সুলতানার প্রথম প্রবেশ..

প্রথম বইটি ওয়েজ অব সিইং , সত্তরের দশকে এটি লিখেছিলেন বৃটিশ শিল্প সমালোচক জন বার্জার, একই নামে তাঁর একটি যুগান্তকারী টিভি প্রামাণ্য অনুষ্ঠানের. ভিত্তি করে। এটি শিল্পী আসমা সুলতানা এবং আমার যৌথ অনুবাদ প্রচেষ্টা। শিল্পী রেনে ম্যাগরিট এর তৈলচিত্র দি হিউমান কন্ডিশন এর ভিত্তি করে বইটির প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করেছেন শিল্পী আসমা সুলতানা। শিল্পকলার অনুরাগী এবং  দৈনন্দিন জীবনে শিল্পকলার প্রভাব কত সর্বব্যাপী হতে পারে, সেটি যারা জানতে আগ্রহী তাদেরকে এই বইটি হতাশ করবে না ।

WOS_book_2015_for_blog

দ্বিতীয় বইটি দি গড ডিল্যুশন, ২০০৬ সালে প্রকাশিত বিবর্তন জীববিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স এর এই বইটির বেশ কয়েকটি অধ্যায় আমি ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করেছিলাম এই ব্লগের জন্য, অনেকেই একারণে এই ব্লগটিতে এসেছেন, অবশেষে এবারের বইমেলায় এটি বই হিসাবে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। এটিরও প্রচ্ছদ পরিকল্পনা করেছেন আসমা সুলতানা তার নিজের একটি চিত্রকর্ম ‘মিরর’ ব্যবহার…

View original 18 more words

Theoretical content: Camille Paglia

Originally posted on Independent Production :

Whilst conducting some research for my project, I came across a writer called Camille Paglia. In 2004 she wrote a journal article for Art Documentation named ‘The Cruel Mirror: Body Type and Body Image as Reflected in Art. Here I came across some interesting ideas that seem to fit perfectly with the project I have in mind.

The main object of my project is focused on societies obsession with beauty; and how this makes girls feel a certain inadequacy towards their body image.

Paglia, like me, wrote this article expressing the woes of beauty, where she drew her ideas based on famous writings ad films in history. She claimed that the title of the article was inspired by Walt Disney’s animated movie, Snow White and the Seven Dwarfs (1937), ‘Where the elegant witch-queen… is obsessively preoccupied with her brutally candid mirror.’ Another piece she drew inspiration from was Oscar Wilde’s The Picture of Dorian…

View original 255 more words

নির্বাসিতের নির্বাসন

নভেরা আহমেদ
শিল্পী নভেরা আহমেদের প্রতিকৃতি, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

নির্বাসিত শিল্পী নভেরা আহমেদ, চিরকালের জন্য নির্বাসনে চলে গেলেন । ভাস্কর নভেরা আহমেদের মৃত্যুতে আমরা বাঙালিরা শোকাহত । দেশে বা প্রবাসে সবখানেই শিল্পী নভেরার মৃত্যুর শোকের চিহ্ন। কোনো মৃত্যুই কাম্য নয় । তা সে পূর্ণ বয়সের মৃত্যুও হোক না কেনো । মানুষ কখনই তার প্রিয়জনকে হারাতে চায় না । আর সে যদি হয় অসাধারণ প্রতিভাবান কেউ তবে তো কথাই নেই । আপনজন কেনো, কাছের-দূরের কোনো মানুষই সেই চলে যাওয়াকে সহজভাবে মেনে নিতে পারে না । মানুষ চায় তার স্মৃতিকে অবিস্মরনীয় করে রাখতে । তার চলে যাওয়াকে মেনে নিতে পারলেও, সময়ের একটা কঠিন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় সবাইকে । একমাত্র সময়ই পারে, সব কিছুকে ভুলিয়ে দিতে । সময়ের কথায় মনে পড়ে গেলো, নভেরার জীবনের বিভিন্ন সময়ের সমসাময়িক পারিপার্শ্বিকতার কথা। আমরা নভেরা সম্পর্কে কতটুকু জানতে পেরেছি আসলে?

ওয়ান্স ইন আমেরিকা, শিল্পী নভেরার সৃষ্টি, ৬৮-৬৯
ওয়ান্স ইন আমেরিকা, শিল্পী নভেরা আহমেদের সৃষ্টি, ৬৮-৬৯, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

বাস্তবে, শিল্পী নভেরা সম্পর্কে তেমন করে জানার উপায় নেই । যেমন করে আমরা বাংলাদেশের আর যে কোনো শিল্পী বা শিল্পকলা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ক্ষেত্রে অজানা একটা অন্ধকারে বাস করে আসছি। শিল্পী নভেরা আহমেদের কথা আরো বেশী রহস্যময় এবং অন্ধকারে ঘেরা। কারণটা হয়তো কারো আর অজানা নেই। তিনি ছিলেন স্বেচ্ছায় নির্বাসিত। চার দশক সময় ধরে। চল্লিশটা বছর, কম সময় নয় মহাকালের হিসাবেও। ৮৫ বছরের দীর্ঘ জীবনের প্রায় অর্ধেকটা তিনি বাংলাদেশ থেকে দূরে । বাংলাদেশ বললে হয়তো ভুল হবে; তিনি বাংলাদেশের শিল্পী ছিলেন কি ; বা স্বাধীন বাংলাদেশ বললে হয়তো আরো সঠিক করে বলা হবে । তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কখনও স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেননি। তিনি তাঁর নিজের জন্মভূমি থেকে ছিলেন স্বেচ্ছায় নির্বাসিত। সেই সময় যাকে সবাই ভারতীয় উপমহাদেশ বলে জানতো, পরবর্তীতে পূর্বপাকিস্থান! আমরা সেই অবস্থান থেকে আসলে তাকে কতটুকু আমাদের দেশের শিল্পী বলে দাবী করতে পারি আমার জানা নেই । তেমন করে তো আমরা বাংলাদেশের মাটিতে জন্মগ্রহনকারী সূচিত্রা সেনের মতো এবং আরো অনেকে আছেন তাদেরকে, আমাদের নিজেদের বলে দাবী করতে পারি। যিনি চল্লিশ বছর আগে আমাদেরকে পিছনে ফেলে চলে গিয়েছেন এবং ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করেননি, তাকে আমাদের বলে অধিকার করবার অধিকার আমাদের আছে কিনা জানি না। মূলত কোন কারণে তিনি দেশ ত্যাগী হলেন সেটাও আমরা জানি না। আমরা কেনই বা জানতে চায় ? কারণ তিনি আমাদের দেশের (?) অর্থাৎ তৎকালীন পূর্বপাকিস্থানের শিল্পী ছিলেনএবং তিনি ছিলেন একজন জনপ্রিয় মানুষ, সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষ, তাঁর সম্পর্কে আমরা, সাধারণ মানুষেরা জানতে চায়বো সেটাইতো স্বাভাবিক । কিন্তু আমাদের হয়তো কখনও জানা হবে না, দেশ ছেড়ে যাবার পরেও, কেনো তিনি আমাদের প্রিয় দেশ, বাংলাদেশের মাটিতে কোনোদিনো ফেরার কথা ভাবেননি। বাংলাদেশের জন্মের আগেই তিনি নিজের জন্মভূমি ছেড়ে বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমিয়েছেন এবং সেই দেশকে তিনি আপন করে নিয়েছেন।

নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য
শিল্পী নভেরা আহমেদের ভাস্কর্য, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

আমরা জানি, তিনি কোনো  সুবিধা বঞ্চিত পরিবারের সদস্য ছিলেন না। তিনি বেশ ভাগ্যবতীও ছিলেন, যার এমন অনেক বন্ধুমহল ছিলো যারা তাঁকে, তাঁর প্রতিভার মূল্যায়ন করেছেন। তাঁর শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন । তাহলে তাঁর জীবনে মূলত বাধা বা প্রতিবন্ধকতাটা কোথায় ছিলো ? জীবনের প্রথমদিকে তিনি বেশ সুযোগ সুবিধা পেয়েছেন, ইংল্যান্ড ও ইউরোপে শিক্ষা লাভের সুযোগ পেয়েছেন, সে সময় অনেকের জন্য যা ছিলো শুধুই স্বপ্নের মতো। অনেকের জন্য এখনও সেটা স্বপ্নই বটে। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পেয়েছেন প্রদর্শনীর সুযোগ । কিন্তু তাঁর পথচলাকে শেষ পর্যন্ত কেনো একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেননি তা আমাদের আর হয়তো জানা হবে না । কারণ শিল্পীর কাজ বা পথচলা সম্পর্কে যদি কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারে , সে হলো শিল্পী নিজে । আমাদের দেশে সেই সুযোগ অনেক ক্ষীণ । তার কারণ হিসেবে আমি বলতে পারি সহজেই; আমাদের প্রকৃত শিক্ষার এবং অভিজ্ঞতার অভাব, সর্বপরি আমাদের সততার এবং স্বচ্ছতার অভাব । তিনি তাঁর সেই অসাধারণ স্কুলিংকে ব্যাবহার করে তাঁর কাজকে আরো পরিশালিত করতে পারতেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতাগুলো কে তিনি আরো অভিব্যক্তিময় করে তুলতে পারতেন ।

শিল্পকর্মের মাঝে শিল্পী নভেরা আহমেদ
শিল্পকর্মের মাঝে শিল্পী নভেরা আহমেদ, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

তাঁর কাজের প্রতিবন্ধকতা বলতে যদি অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা বলে আমরা ধরে নেই তাহলেও সেটি খুব একটি যুক্তিযুক্ত হবার কথা নয় । কারণ, ষাটের দশক থেকে একবিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত তিনি যদি ফ্রান্সের মতো পৃথিবীর ধনী দেশ এবং প্যারিসের মতো শহরে বসবাস করতে পারেন যেটা কিনা শিল্পকলার তীর্থ স্থান । সেখানে বিভিন্ন ভাবে অর্থনৈতিক সহোযোগিতা মেলা সম্ভব। আর সেটাও যদি না অর্জন করা সম্ভব তাহলে আমাদের সেটাকে চিহ্নিত কার উচিৎ শিল্পী হিসেবে যে, প্রবাসে বসবাসরত শিল্পীদের কাজের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত কি কি ধরনের বাধা বা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখিন হই । এবং সেখান থেকে আমাদের মুক্তির উপায় কি হতে পারে । অথবা যদি ধরে নেই তাঁর কাজের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো ছিলো শারীরিক, তাহলে আমাদের স্পর্শকাতর একটা অবস্থান থেকে বিষয়টাকে বিচার করতে হবে । এবং এটাও আমাদের জানার মধ্যে রাখতে হবে যে পৃথিবীতে শিল্পী মূলত প্রতিবন্ধকতার মধ্যেই বেড়ে ওঠে । সোনার চামচ মুখে দিয়ে কেউ শিল্পী হয়ে জন্মায় না বা গোলাপের পাপড়ি বিছানো বিছানাতে শুয়েও কেউ শিল্পী হয়ে ওঠে না । শিল্পী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা কোনো ভাবেই মসৃন নয় । শিল্পীর সৃষ্টিই শুধু তার পরিচয় নয়, তার জীবন যাপনই একটি অনবদ্য শিল্পকর্ম হয়ে ওঠে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে। যেটাকে লাইফ স্টাইল বলা যায় ! সে ক্ষেত্রে নভেরার কথা আমরা যতদূর জানতে পারি তিনি শারীরিক ভাবে বিদ্ধস্থ ছিলেন । নানা দূর্ঘটনার কারণে তাকে শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে । সে ক্ষেত্রে তিনি ভাস্কর্য ব্যাতিরেকে অন্য আরো অনেক সহজ মাধ্যমেও কাজ করতে পারতেন । হয়তো করেছেনও । আমাদের সঠিক করে জানা নেই ।

নভেরা আহমেদ ও তারঁ স্বামী
নভেরা আহমেদ ও তারঁ স্বামী গ্রেগোয়ার দো ব্রোয়ানস, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

আমাদের জাতীয় শহীদ মিনারে নকশাকে ঘিরে আরো যে নীলনকশার জন্ম হয়েছে, আরো যে ষড়যন্ত্র বা অন্ধকারের জন্ম হয়েছে, সেটার মীমাংসা করার দায়িত্ব তাদের ছিলো যারা এর সাথে শুরু থেকেই জড়িত ছিলেন। আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে যদি সে সম্পর্কে কোনো ভুল তথ্য জানি, সে ক্ষেত্রে দোষটা আমাদের ঘাড়ে না দেয়াটাই উত্তম। আমাদেরকে ক্রমাগত ভাবে আমাদের অতীত ইতিহাসের থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে । সে কারণে আমরা ভবিষ্যত থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি জাতি হিসেবে । বর্তমান বলে তো কোনো কিছুর অস্তিত্ত্ব নেই আমাদের । সব কিছু বায়বীয় । ভিত্তিহীন । শহীদ মিনারের নকশা নিয়ে যে টানাহেচড়া চলছে; তাতে মনে হচ্ছে আমাদের পক্ষে আর কোনো নতুন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা সম্ভব নয় । আমরা কি পারি না নতুন করে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিস্তম্ভ গড়তে ; আমাদের নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের দিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে । পুরাতন স্মৃতিস্তম্ভের পাশাপাশি নতুন করে বা পরিবর্ধিত অবস্থায় কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে?

Original_Model_of_Shaheed_Minar
১৯৫৬ সালে প্রণীত শহীদ মিনারের আদি নক্‌শা ও মডেল, শিল্পী হামিদুর রহমান।চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

শিল্পী নভেরার এই চলে যাওয়াকে ঘিরে আমাদের বাংলাদেশীদের মধ্যে যে কম্পনের সৃষ্টি হয়েছে তাতে করে আমরা আরো বেশী করে জানতে পারি ব্যক্তি নভেরা সম্পর্কে । আর্ন্তজালিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমাদের পরিধিটা বেশ ব্যাপ্তি পাচ্ছে দিন দিন ; বিধায় আমরা আরো বেশী করে জানতে পারছি ব্যক্তি মানুষের কথা। কিন্তু আমাদের জ্ঞানের সীমানা কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখনও সেই সংকীর্নতায় ঘিরে আছে , আছে অন্ধকার হয়ে। নভেরার শিল্পকর্ম সম্পর্কে বিশ্লেষণী কোনো আলোচনা বা সমালোচনার অবকাশ নেই খুব একটা ।

বেশ কয়েক বছর ধরে অর্ন্তজালের সুবাদে নভেরা সম্পর্কে বেশ কিছু সমসায়িক এবং নিকট অতীতের খবর জানতে পারি । আর লেখক হাসনাত আবদুল হাই এর ‘নভেরা’ বইটির কথা তো মনে আছেই; যদিও বেশ কয়েক বছর আগের পড়া । সব মিলিয়ে শিল্পী নভেরার প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহের কমতি ছিলো না কোনোদিনও । কিন্তু শিল্পী নভেরা কি আমাদের কথা ভেবেছেন কখনও । হয়তো ভাবতেন । তাঁর শাড়ী পরে ফরাসী স্বামীর সাথে ছবি দেখলেতো তাই মনে হতে পারে । কিন্তু তিনি কেনো নিজে থেকে আমাদের জন্য দু লাইন লিখে রেখে জাননি ? কেনোই বা তিনি নিজের কাজেরও তেমন কোনো বর্ণনা দিতে আগ্রহ বোধ করেনি তাঁর জন্মভূমির মানুষদের জন্য, তাঁর শুভাকাঙ্খিদের জন্য ? আমরা আমাদের অবস্থান কে সুস্পষ্ট একটা রুপ দিতে ব্যর্থ হচ্ছি বারবার । ফলে ক্রমাগতভাবে আমরা ভ্রান্তিময় একটা জগৎ সৃষ্টি করে যাচ্ছি।

কর্মরত ভাস্কর নভেরা আহমেদ
কর্মরত ভাস্কর নভেরা আহমেদ, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

তাঁর অভিমানের গভীরতায় মনে হয় তিনি গভীর ক্ষত (?) নিয়ে দেশ ত্যাগ করেছিলেন । তাঁর দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের এক ফেইসবুক পোস্ট থেকে যেটা জানান যায় তাতে করে মনে হয় খুব বালখিল্য একটা কারণে তিনি দেশ ত্যাগ করেছেন এবং পারিবারিক কারণে দেশ ত্যাগ করা আর রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে দেশ ত্যাগ করা ভিন্ন বিষয় । তিনি যদি ব্যক্তিগত কারণে দেশ ত্যাগ করে থাকেন সে ক্ষেত্রে জাতি হিসেবে আমাদের অপরাধবোধে ভোগানোর কোনো অধিকার হয়েতো নেই । তবে দেশ ত্যাগের তাঁর সেই ক্ষতটুকুই যথেষ্ট ছিলো একজন শিল্পীর শিল্পচর্চার জন্য । একজন শিল্পীর পথচলার জন্য । ফ্রিদা কাহলোর কথা মনে হতে পারে আমাদের । তাঁর শরীরে সে কত যন্ত্রণা বয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে । তারপরেও তাঁর কাজের মধ্যে সে সব যন্ত্রণাকে সে অভিব্যক্ত করতে দ্বিধা বোধ করেনি । নভেরা আহমেদের কাজের মধ্যে তাঁর জীবনবোধের যন্ত্রণার সানাইয়ের সুর বাজতো কিনা আমি জানি না । আমি দেখিনি তাঁর চিত্রকর্ম নিজ চোখে । হ্যা অবশ্যই অতীতের কিছু ভাস্কর্য ছাড়া ; তবে তেমন কোনো গভীর বেদনাবোধ ধরা পড়ে না তাঁর কাজে ।

হেনরী মুরের ভাস্কর্য
১৯৪৭ এ নির্মীত হেনরী মুরের ভাস্কর্য ফ্যামিলি গ্রুপ, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

শিল্পী বা ভাস্কর নভেরার কাজে ব্রিটিশ ভাস্কর হেনরী মুর এবং বারবারা হেপওয়ার্থ এর প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট । বলাই বাহুল্য শিল্পী নভেরা পঞ্চাশের দশকে ইউরোপেই থাকতেন । তাঁর জন্য পৃথিবী বিখ্যাত সেই সব ভাস্করদের কাজের সান্নিধ্যে আসাটা খুব একটা কষ্ট সাধ্য বিষয় ছিলো না । যদিও বারবারা হেপওয়ার্থ কিংবা হেনরী মুরের ভাস্কর্যের ভলিউম বা ঘনত্বের সাথে নভেরার ভাস্কর্যের তেমন কোনো সাদৃশ্যতা নেই । সেখানে নভেরার ভাস্কর্যকে অনেক ক্ষেত্রে চ্যাপ্টা মনে হতে পারে । বেশীরভাগক্ষেত্রে তিনি ক্লোজড এবং অর্গানিক ফর্ম নিয়ে কাজ করতেন । পরিবারের প্রতি তাঁর যে একধরনের দূর্বলতা ছিলো সেটাও ফুটে ওঠে তাঁর কাজে ; যেমন হেনরী মুরের কাজেও দেখা যায় ।

বারবারা হেপওয়ার্থের ভাস্কর্য , ডুয়েল ফর্ম
বারবারা হেপওয়ার্থের ভাস্কর্য , ডুয়েল ফর্ম, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

শিল্পকলায় সারা পৃথিবীতে, রেনেসাঁর পরবর্তী সময়ে, ভাস্করদের থেকে চিত্রকরদের সংখ্যাই বেশী ছিলো । চিত্রকলা চর্চা ছিলো অনেক বেশী সহজ , ভাস্কর্য চর্চার থেকে । ভাস্কর্য চর্চার জন্য স্হান এবং নির্মান সরঞ্জামের যোগান একটা বিরাট চ্যালেন্জ সব সময় । সে ক্ষেত্রে ভাস্করদের সংখ্যা তুলনা মূলকভাবে কম ছিলো সারা বিশ্বে এবং নারী ভাস্করতো অবশ্যই কম । নভেরা আহমেদকে উপমহাদেশের প্রথম আধুনিক ভাস্কর বলা হয় । শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন স্যার যেমন উপমহাদেশের আধুনিক শিল্পকলার জনক । যার সূচনা হয় কবিগুরু রবিন্দ্রনাথের হাতে । কিন্তু আমাদের এই অর্জনগুলোকে আমরা সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছি । এমনকি পার্শ্ববর্তীদেশ ভারতও যখন এগিয়ে গিয়েছে তখন, আমরা দিনে দিনে পেছনের দিকে হেটে চলেছি …

সেই প্ঞ্চাশ-ষাটের দশকেই নভেরার কাজে আধুনিকতার ছোয়া দেখতে পান অনেকেই ; কিন্তু তারো বহু আগে ১৯১৭ সালে ইতিমধ্যেই ফাউন্টেন নামে একটি ফাউন্ড অবজেক্টের মাধ্যমে ফরাসী শিল্পী মার্শাল ডুশ্যাঁ কন্সেপচুয়াল শিল্পকলার যাত্রা শুরু করিয়ে দিয়েছিলেন । সে ক্ষেত্রে শিল্পকলায় আধুনিকতার শুরু আমরা ইম্প্রেশনিজম সময় থেকেই ধরে নিতে পারি । নভেরা আহমেদ সেই সময় ইউরোপে বসবাসরত ছিলেন ; আধুনিক ভাস্কর্যের চরিত্র তাঁর কাজে আরো বিলষ্ঠ ভাবে ধরা পড়বার কথা ছিলো। যখন ভাস্কর্য জগৎকে আলোকিত করছিলো, হেনরী মুর, বারবারা হেপওয়ার্থ, আলেক্সান্ডার কেল্ডার, আলবার্টো জিওকোমেত্তি, কনস্টান্টিন ব্রাঙ্কুইসি এবং আরো অনেকে । ভাস্কর রঁদ্যারও তিনি ভক্ত ছিলেন, সেটা যে কোনো ভাস্কর মাত্ররই হওয়ার কথা । ২০০৮ এবং ২০০৯ এ নির্মীত কিছু ভাস্কর্যে তিনি ভাস্কর জিওকোমেত্তির মতো অমসৃন সমতল ব্যবহার করেছেন । একজন মানুষের প্রতিকৃতি মূর্তিতে দেখা নাক, কান বিহীন যেনো পরিচয়হীন, অনুভূতিহীন কোনো মানুষ। আবদ্ধ , বিস্মৃত । যথারীতি শিল্পী পিকাসোরও প্রভাব লক্ষ্য করা যেতে পারে তাঁর ভাস্কর্যে ।

শিল্পী নভেরার ভাস্কর্য , ২০০৯
শিল্পী নভেরার ভাস্কর্য , লো ব্যারন ফু, ২০০৯, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

কলোম্বিয়ান শিল্পী ডরিস সালসেদোর এর কাজেও আমরা দেখি স্বদেশ ত্যাগের যন্ত্রণার কথা। তিনিও দেশ থেকে নির্বাসিত । অনেক শিল্পীকেই দেশ থেকে নির্বাসিত হতে হয়েছে, আরমেনিয়ান শিল্পী আর্শাইল গোর্কি ; কিন্তু তাঁদের কাজে আমরা দেখি সেই যন্ত্রণার ছাপ, যা শিল্পী নভেরার কাজে বেশ অনুপস্থিত। গোর্কির চিত্রকর্মে মা ও মাতৃভূমি ত্যাগের বেদনা সুস্পষ্ট । নভেরার প্যারিসের রেট্রোস্পেকটিভ প্রদশর্নীর চিত্রকর্মগুলোর যে অস্পষ্ট ইমেজ আমরা দেখি অর্ন্তজালে, সেখান থেকে মনে হয়; সেগুলোকে পরাবাস্তব বা ফভিজমের মতো করে অনেক উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার করা হয়েছে এবং পাখির ও ফুলের মতো অনেক অর্গানিক ফর্মকে ব্যবহা করা হয়েছে; শিল্পকলার বিষয় বস্তু নির্বাচনে । স্ফিংসও দেখা যায় তাদের মধ্যে । যেগুলোকে দেখে সুরিয়েলিস্ট শিল্পী ম্যাক্স আর্নস্ট এর চিত্রকলার অদ্ভুত সব পাখিদের ফর্মের কথা মনে হতে পারে ।

6304novera
শিল্পী নভেরার ভাস্কর্য, লা শেভ দো শাঁতেমেসল, ২০০৮, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

নভেরার স্বেচ্ছা নির্বাসনের সাথে ফরাসি ভাস্কর কামিল ক্লদেলের নির্বাসনের ইতিহাস যদিও মেলে না, তবুও তাদের মধ্যেকার ভাস্কর্যের প্রতি যে উন্মদনা আছে তাতে অনেক মিল পাওয়া যায় । তাদের জেদের মধ্যে মিল পাওয়া যায় । তাদের দুজনের জীবনের ঘটনাগুলোকে অনেক বেশী নিয়তি নির্ভর মনে হতে পারে । কামিল ক্লদেলকে আধুনিক ভাস্কর্যের একজন অগ্রদূত বলে মনে করা হয় । কামিল এবং রদ্যাঁ দুজনই শিল্পী মাইকেল্যান্জোলোকে ধারণ করেছেন তাঁদের কাজের মধ্যে । কামিলও একজন উপেক্ষিত ভাস্কর এবং রঁদ্যা যাকে ব্যবহার করে সুনাম কামিয়ে নিয়েছিলো সেই সময়ে । সেই কামিল ক্লদেলের জীবনীও কম বেদনাদায়ক ছিলো না । তিনিও তিরিশ বছর নির্বাসিত ছিলেন এক মানসিক হাসপাতালে ।

DSC_4995
শিল্পী পিকাসোর ভাস্কর্য, মোমা : নিউ ইয়র্ক আলোক চিত্র : আসমা সুলতানা

প্যারিসের রেট্রোস্পেকটিভ প্রদশর্নীর ব্রুশারে, প্রদশর্নীটির কিউরেটর প্যাট্রিক আমিন দাবী করেছেন যে, নভেরা কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন । তাঁর কাজের মধ্যে কবিগুরুর কবিতার কথা ফুটে ওঠে । নভেরা আহমেদ যে অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে জন্ম গ্রহন করেছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই । জীবনে অনেক সুযোগও তিনি পেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন সংগ্রাম কে এবং শিল্প সংগ্রমকে তিনি একটি সুনিপুন পর্যায়ে পৌঁছে নিতে ব্যার্থ হয়েছেন । কিন্তু কেনো ? তাহলে কি আমাদের উপমহাদেশের শিক্ষা ব্যাবস্থায় বিরাট কোনো ঘাটতি আজো রয়ে গেছে, সেই সময় থেকেই !

তিনি দেশকে কি মনে করতেন না, যে তাঁর কাজের মধ্যে আমরা স্বদেশ ত্যাগের বেদনার ভাষা খুঁজে পাই না। দেশকে তিনি মনে করবেন কিভাবে? ৪০ বছর তো কম সময় নয়, বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাবার জন্য । কিন্তু আরো কয়েকটি প্রশ্ন আমার সাধারণ শিল্পী মনে ভেসে ওঠে সেগুলো হলো ; কেনো একজন শিল্পীকে দেশ ত্যাগ করতে হয় ? শিল্পীরা কেনো দেশত্যাগী হন ? শিল্পীরা কেনো স্বেচ্ছায় নির্বাসনে যান? দেশ কি চায় না তার প্রতিভাবান সন্তানকে জায়গা দিতে ? দেশ কি তার প্রতিভাবান সন্তানকে ফেরাতে চেয়েছে কখনও ? দেশ কি তার প্রিয় শিল্পীকে ফেরাতে চেয়েছে কোনোদিনও ? শিল্পী সমাজের ভূমিকা কতটুকুইবা ছিলো এক অভিমানী শিল্পীর অভিমান ভাঙ্গাতে ?

6302novera
শিল্পী নভেরার সৃষ্টি, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

শিল্পী এস এম সুলতানও তো ছিলেন একঘরে, কে তাঁর খোঁজ রেখেছে ! আমরা তবে কেনো নভেরা আহমেদের ব্যাপারে এখন বেশ উচ্চবাচ্য করছি; তিনি ফ্রান্সের মতো ধনীদেশের বাসিন্দা ছিলেন বলে ? সুবিধাপ্রাপ্তদের একটু তোষণ করে চলবার সংস্কৃতি আমাদের চিলকালের । আমরা তো স্বাধীনতার পর থেকে বেশ একটা লম্বা সময় পেয়েছিলাম এই ঘোলাটে ঘটনাকে একটা সমাধানের আলো দেখানোর । এবং সব পক্ষের জন্যই সেই সময়টা ছিলো নিজের অবস্থানকে পরিষ্কার করবার । যাতে করে কাউকেই সেই দোষের বোঝাগুলো বয়ে বেড়াতে না হতো । নভেরা আহমেদ কে অনেকে কিংবদন্তীয় বলে আখ্যায়িত করছেন, কিন্তু আমরা জানি না সেই শব্দের অর্থ কি? নাকি আমরা শব্দের পরে শব্দ সাজাতে পচ্ছন্দ করি। যেমন রঙের পাশে রঙ বসিয়ে আপন মনে আমরা এঁকে যাই অর্থহীন যত চিত্রকর্ম । যার কোনো অর্থ হয় না ; যার কোনো ইতিহাস হয় না । যা শুধু হয়ে ওঠে প্রাণহীন এক শরীর; শিল্প হয়ে উঠতে পারে না কখনই ! তিনি নির্বাসনে ছিলেন বলেই কি তিনি কিংবদন্তী ! হয়তো বা আমাদের কারো কারো ক্ষেত্রে কিংবদন্তী খোঁজার মানসিকতা, কাউকে আইকনিক রুপ দেবার অতিআগ্রহ অনুৎসাহিত করে দেয় সব ধরনের বিশ্লেষণ প্রচেষ্টা। সামাজিক সেই অদৃশ্য কর্তৃত্বের চাপটি হয়তো তারা অনুভব করেন এই সিদ্ধান্তে পৌছাঁতে। কোনো কোনো ব্যক্তি বিশেষকে আমরা এমন একটা বিশেষ স্থানে বসিয়ে দিতে পচ্ছন্দ করি যেখান থেকে আসলে বিভ্রমের সৃষ্টি হওয়া ছাড়া তেমন কোনো অর্জন করা সম্ভব না ।

তবে সব কিছু বিশ্লেষণ করে আমরা যেটুকু বুঝতে পারি, সেটা হলো শিল্পী নভেরা আহমেদের মৃত্যু আমাদের মাঝে কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেলো আবার …

১. কেনো একজন শিল্পীকে নির্বাসিত হতে হয় ?

এবং

২. কেনো বাংলাদেশ গুনী প্রতিভাধর মানুষকে তার যোগ্য স্থান দিতে ব্যার্থ হচ্ছে বারবার ?

উত্তরটা সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভয়ঙ্কর । রাজনীতি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রিয়তা, দলাদলি, সংকীর্নমন্যতা, আধুনিক শিক্ষারপ্রতি অনাগ্রহ শিল্পী সমাজের আটপৌরে জীবনের সঙ্গি । সেখানে কোনো সৎ প্রতিভাবানদের স্থান নেই !

কিন্তু একজন শিল্পী কি নিজের মেধা দিয়ে, শক্তি দিয়ে, সততা দিয়ে সেই যুদ্ধে জয়ী হতে পারেন না?

প্রশ্নটা  কেনো আমি নিজেকে নিজে করছি না ?

novera-3
শিল্পী নভেরার প্যারিসের প্রদশর্নীর একটি আংশিক চিত্র, চিত্র সূত্র : অন্তর্জাল

বিধ্বংসী ভালোবাসা

জন্মদিন, মার্ক শাগাল , ১৯১৫, কার্ডবোর্ডে তৈলচিত্র
জন্মদিন, মার্ক শাগাল , ১৯১৫, কার্ডবোর্ডে তৈলচিত্র

“শুধুমাত্র ভালোবাসাতেই আমার আগ্রহ, এবং আমি সেই সব বিষয়গুলোর সংস্পর্শে আসতে পছন্দ করি যাদের সৃষ্টি ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেই”- রুশ চিত্রশিল্পী মার্ক শাগালের উক্তি । পৃথিবীর তাবৎ শিল্পীদের মনের কথাই হয়তো এটা । অন্তত আমার মনের কথা তো বটেই । ভালোবাসা ছাড়া সৃষ্টি কি সম্ভব ? কখনই সম্ভব নয় । শিল্পীদের ভালোবাসার প্রকৃতি যদিও বেশ অদ্ভুত হয়ে থাকে । তারা সব কিছুকে ভালোবাসাতে পারে, আবার হয়তো বা কোনো কিছুকেই ভালোবাসে না, কিছুটা হলেও নার্সিসিজম কাজ করে এমন ভাবাটাও অমূলক নয়। এমন এক অদ্ভুত টানাপোড়নের মধ্যে হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা যন্ত্রণা, হতাশা, কষ্ট বা না পাবার বেদনায় তিলে তিলে তারা সৃষ্টি করে যায় এক একটি শিল্পকর্ম, যেনো অদৃশ্য কোনো মাতৃ জঠরে জন্ম নিচ্ছে নিত্য নতুন শিশু ।

লেটার টু মাই আন বর্ন চাইল্ড, আসমা সুলতানা
লেটার টু মাই আন বর্ন চাইল্ড, আসমা সুলতানা, ২০১৪, মিশ্র মাধ্যম ( কাঁচ, সোনালী ম্যাট বোর্ড, ফাইন পেপার, মরা ঘাস ফড়িং, আমার চুল, সুঁচ ও সুতা )

শিল্পীরা চিরপ্রেমিক, তারা প্রেমে বুদ হয় প্রতিনিয়ত, সে প্রেম হতে পারে প্রকৃতির জন্য, মানুষের জন্য এমনকি শিল্পের জন্য ও । শিল্পীদের ভালোবাসার বা প্রেমের সেই রহস্যময় জগতটি কেমন, আমাদের হয়তো অনেকটাই অজানা । কিন্তু কোনো শিল্পীকে এবং তার শিল্পকর্মকে জানতে বা বুঝতে গেলে, তার জীবন সম্পর্কে অবশ্যই আমাদের জানতে হবে । ভালোবাসা ব্যতীত কোনো শিল্পীই, শিল্পী হয়ে উঠতে পারে না । সেদিক থেকে বিবেচনা করলে শিল্পী সত্ত্বাকে তার প্রেমিক সত্ত্বা থেকে আলাদা করে দেখার কোনো অবকাশ নেই ।

আত্মপ্রতিকৃতি, ভিনসেন্ট ভ্যান গো (গখ্/ গফ/ গগ) (১৮৫৩-১৮৯০) ১৮৮৭, বোর্ডে তৈলচিত্র
আত্মপ্রতিকৃতি, ভিনসেন্ট ভ্যান গো (গখ্/ গফ/ গগ) (১৮৫৩-১৮৯০) ১৮৮৭, বোর্ডে তৈলচিত্র

১৮৮৮ সালের ডিসেম্বরের ২৩ তারিখের এক শীতের রাত। দক্ষিন ফ্রান্সের একটি শহর আর্লস; আমরা সেই রাতের কথা জানি যখন, ডাচ শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গো একটি কাগজের মধ্যে কিছু একটা জাড়িয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তাঁর পায়ের ধাক্কায় পাথর ছিটকে পড়ছে এদিকে সেদিকে, তাঁর টালমাটাল চলার ভঙ্গি আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে সে প্রকৃতিস্থ নয় । অন্ধকারের ভেতরেও লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, তাঁর কানের পাশ দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে । সে তাঁর গন্তব্যে থেমে যায় এবং একটি দরজায় ধাক্কা দেন । চিরপরিচিত সে দরজা এবং পরিচিত এক রমণী দরজা খুলে দিয়ে খুব চেনা ভঙ্গিতে তাঁকে ভেতরে আসতে বলে, শিল্পী ভিনসেন্ট সেই রমণীর হাতে তাঁর কাগজের প্যাকেটটি গুজে দিয়ে দ্রুত পায়ে ফিরে যান। অতঃপর আকাশে বাতাসে নারী কন্ঠের চিৎকার ভেসে আসে …

কানে ব্যান্ডেজ বাধা আত্মপ্রতিকৃতি, ভিনসেন্ট ভ্যান গো, ১৮৮৯
কানে ব্যান্ডেজ বাধা আত্মপ্রতিকৃতি, ভিনসেন্ট ভ্যান গো, ১৮৮৯

ভিনসেন্ট তাঁর কানের খানিকটা অংশ কেটে সেই পতিতাকে সে রাতে উপহার দিয়ে আসেন, কিন্তু ভিনসেন্ট কেনো তাঁর নিজের কান কাটতে যাবেন ? আজো আমাদের কাছে অজানা । সবাই ভালোবাসার রমণীকে ফুল উপহার দেয়, দেয় মূল্যবান কোনো বস্তু, ভিনসেন্ট কেনো নিজের কান ছিড়ে দিতে যাবেন ? কে জানে ? সে ঘটনার কোনো সুস্পষ্ট সাক্ষী বা তথ্য আমাদের জানা নেই । মনে করা হয় ভিনসেন্ট ও শিল্পী গঁগ্যা দুজনই খুব চাপা স্বভাবের ছিলেন বলে কেউ কোনো দিনো সে বিষয়ে মুখ খোলেননি। অনেকের ধারণা, হয়তো শিল্পী বন্ধু পল গগ্যাঁ’র সাথে তার তর্কবিতর্কে বা হাতাহাতির ফলে এমন দূর্ঘটনা ঘটেছিলো যে ভিনসেন্ট তাঁর কানটাকে বাঁচাতে পারেনি, অথবা হিংসা বশত নিজেই নিজের কান কেটে দিয়ে এসেছিলো সেই পতিতাকে যাকে সে পেতে চেয়েছিলো খুব আপন করে (?)। অথবা তাঁর অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণাকে ভুলতে গিয়ে, সে তাঁর শারীরিক কষ্টকে বাড়িয়ে নিতে চেয়েছিলো শতগুনে । ভিনসেন্ট একর পর এক আত্মঘাতী প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রত্যাখানের বেদনাগুলো কে ভুলতে চেয়েছিলের তার জীবদ্দশায় । যদিও সেকারণেই ১৮৮৯ সালের শুরুর দিকে আমরা উপহার পাই অসাধারণ এক শিল্পকর্ম; যার শিরোনাম ছিলো – “ কানে ব্যান্ডেজ বাধা আত্মপ্রতিকৃতি” । ভিনসেন্ট ভ্যান গো আরো একবার পৃথিবীকে জানিয়ে দিলেন, কষ্ট ছাড়া সৃষ্টি হয় না ।

শিল্পী পল গগ্যাঁ’র আঁকা ভিনসেন্ট ভ্যান গো এর প্রুতকৃতি - ‘সূর্যমুখীর শিল্পী’, ১৮৮৮
শিল্পী পল গগ্যাঁ’র আঁকা ভিনসেন্ট ভ্যান গো এর প্রুতকৃতি – ‘সূর্যমুখীর শিল্পী’, ১৮৮৮

আরো একটু অতীতের দিকে ফিরে গেলে দেখা যাবে যে, ১৮৭৫ সালে ভিনসেন্ট যখন তার চাচার লন্ডনের গুপিল গ্যালারিতে কর্মরত ছিলেন একজন সাধারণ শিল্পকর্ম বিক্রেতা হিসেবে ; তখন তিনি সেখানে উরসুলা লয়ার নামের ৫৮ বছরের বেশী বয়স্ক এক বিধবা মহিলার বাসায় লজিং থাকতেন। তিনি তাঁর ১৯ বছর বয়সি মেয়ের সাথে একটি বাচ্চাদের স্কুল পরিচালনা করতেন সেই বাড়ীতেই। ভিনসেন্ট সেই সময় উরসুলা লয়ারের কন্যা ‘ইউহেনিয়া লয়ার’র অনুরাগ প্রার্থী হন। ভিনসেন্ট জানতো না যে গোপনে ইতিমধ্যে অন্যকারো বাগদত্ত্বা হয়ে আছে, বা জানলেও ভিসেন্টের অদম্য আগ্রহ সে চাপা দিতে না পেরে, উরসুলা কন্যাকে ভালোবাসার কথা ব্যাক্ত করেন । কিন্তু হায় ! তাকে শুধু প্রত্যাখানই করা হয়না, করা হয় অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে, অপমানও করা হয় নির্মম ভাবে । যদিও ভিনসেন্ট ইউহেনিয়া কে অনুরোধ করে সেই সম্পর্ক ছিন্ন করতে তাঁর জীবনে চলে আসতে, কিন্তু তাতেও সে রাজি না হলে, ভগ্নহৃদয় ভিনসেন্ট মারাত্মক ভাবে মানসিকভাবে দূর্বল হয়ে পড়েন। ফলশ্রুতিতে ভিনসেন্ট নিজেকে সবার থেকে দূরে সরিয়ে নেন, একা হয়ে পড়েন । কোনো এক পর্যায়ে তিনি ভাই থিওকে চিঠিতে লেখেন ‘আমি হয়তো সারা জীবন চিরকুমার রয়ে যাবো ’।

১৮৭৩ সালে ভিনসেন্টের আঁকা রেখাচিত্রে লন্ডন
১৮৭৩ সালে ভিনসেন্টের আঁকা রেখাচিত্রে লন্ডন

নারীজাতি শক্ত পুরুষের নিকট যতটা নমনীয় আচরন করতে পারে, ভিনসেন্টের মতো শিশুর মতো সরল একজন পুরুষের নিকট তারা ততটাই নির্মম  হয়ে উঠতে পারে ।

ইউহেনিয়া লয়ার
ইউহেনিয়া লয়ার

যদিও ছোটো ভাই থিও কে ভিনসেন্ট সব সময় চিঠি লিখেতেন কিন্তু, তাঁর ভালোবাসা বা প্রণয় বিষয়ে সে খুব কম উল্লেখ করেছে । ১৮৮১ সালের নভেম্বর মাসে, সে থিও কে লেখে “আমি একজন নারীকে চলে যেতে দিয়েছি, সে অন্যকে বিয়ে করেছে । আমি তার কথা ভোলার জন্য অনেক দূরে চলে এসেছি, ভুলতে পারিনি । বিধ্বংসী ।”— কথা গুলো থিওকে সে বলে ছিলো ক্যারোলাইনকে উদ্দেশ্য করে ।

 ভ্যান গো এর অনুজ থিও ভ্যান গো (১৮৫৭-১৮৯১) ভ্যান গো এর অনুজ থিও ভ্যান গো (১৮৫৭-১৮৯১)

যদিও মনে করা হয় ইউহেনিয়া ভিনসেন্টের প্রথম প্রেম, তবে মতান্তরে ভ্যান গো এর আগেও একজন  তরুনীর প্রেমে পড়ে বলে মনে করা হয় । তার নাম ক্যারোলাইন হানবেক । নেদারল্যান্ডের রিজউইকে তাদের সংক্ষিপ্ত এক সাক্ষাতে ভিনসেন্ট এই তরুনীর প্রেমে পড়ে যান- যাকে তিনি নাম দেন ‘সব থেকে কোমল বুনোফুল’ বলে । কিন্তু যখন জানতে পারেন তাঁরই এক জ্ঞাতিভায়ের সে বাগদত্ত্বা তখন, ভিনসেন্ট তাঁর অনুজ থিও কে বলেছিলো “আমি যদি কোনো ভালো রমণী খুঁজে না পায়, তবে খারাপই সই’- আমি একা থাকতেপারবো না, কোনো পতিতা হলেও চলবে”। যদিও ভিনসেন্ট সব সময় শারীরিক চাহিদা থেকে তাড়িত হবার চেয়ে, মানসিক আশ্রয় খুঁজতেন, খুঁজতেন সমমনা কোনো নারীকে, তার চিন্তা চেতনার সঙ্গি করতে । ক্যারোলাইনের কথা ভিনসেন্ট তাঁর চিঠিতে নানা স্থানে উল্লেখ করেছেন । এমনকি তিনি ক্যারোলাইন এবং তার স্বামী উইলেমকে ও চিঠি লিখতেন । থিওকে কোনো একটি চিঠিতে ভ্যান গো উল্লেখ করেছিলেন, অল্প বয়সের সেই প্রেম ও প্রত্যাখানের কথা, সেই প্রত্যাখানের বেদনা যে বৃথা যায়নি সেটাও তিনি নিশ্চিত করেছেন । ভিনসেন্টের সাহসী সব পদক্ষেপ এবং জীবনকে ঝুকির মধ্যে ঠেলে দিয়েও তিনি তার সৃষ্টিকে রেখেছিলেন সচল, জীবনের সব ব্যার্থতা কে পিছনে ফেলে তিনি শিল্পকে আপন করে নিয়েছিলেন ।

স্টারি নাইট, ভিনসেন্ট ভ্যান গো, ১৮৮৯,  মোমা , আমেরিকা, আলোকচিত্র: আসমা সুলতানা
স্টারি নাইট, ভিনসেন্ট ভ্যান গো, ১৮৮৯, মোমা , আমেরিকা, আলোকচিত্র: আসমা সুলতানা

ইউহেনিয়া লয়ারের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এবং মানসিকভাবে বিভ্রন্ত ভবিষ্যৎ শিল্পী যখন হল্যান্ডে ফিরে যান তখন, তার জ্ঞাতিবোন কি ভসে’র প্রেমে পড়েন আবার । ১৮৮১ সালের অগাস্ট মাসে কি ভসে সদ্য বিধবা হয়ে ঘরে ফিরেছেন তার পুত্রকে নিয়ে । এবং ভিনসেন্ট প্রেমে ব্যার্থ হয়ে পুনরায় জীবনে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। তিনি তাঁর জ্ঞাতিবোন কি ভসে কে প্রেম নিবেদন করলেন এই বলে যে; ‘আমি তোমাকে ততটুকুই ভালোবাসি যতটুকু নিজেকে’-‘তুমি কি আমাকে বিয়ে করার ঝুকি নেবে’? স্বাভাবিক ভাবেই পারিবারিকভাবে বাধা আসে । কারণ, উনবিংশ শতাব্দীতে হল্যান্ডে চাচাতো-মামাতো ভাই বোনের মধ্য বৈবাহিক সম্পর্ক হওয়াকে নিষিদ্ধ বলে গন্য করা হতো । কি এর বাবা তার মেয়ের সাথে ভিনসেন্ট কে দেখা করতে না দেয়ায়, তাঁর ধারণা হলো যে, মেয়ের বিরুদ্ধে তিনি কাজ টা করছেন বলে ভিনসেন্ট জোর করে, কি এর সাথে দেখা করতে চান একদিন এবং একটি জ্বলন্ত মোমবাতির শিখায় হাত রেখে বলেন “ আমাকে ওর সাথে দেখা করতে দাও, তা না হলে আমি আমার হাত সরাবো না এই আগুন থেকে ”।

ভিনসেন্টের জ্ঞাতিবোন কি ভসে ও তার পুত্র, ১৮৮০
ভিনসেন্টের জ্ঞাতিবোন কি ভসে ও তার পুত্র, ১৮৮০

কিন্তু হায়, নিয়তি যাখন ঠিক করে রেখেছে তাঁর ভাগ্যে ভালোবাসা জুটবে না, কোনোদিনো । নিয়তিকে কে খন্ডাতে পারে ? কি ভসে আবারো নির্মম ভাবে এই ক্ষেপাটে শিল্পীকে প্রত্যাখান করেছিলো । এবং চিৎকার করে বলেছিলো ‘না , নাহ, কখনই না !’

শিল্পীভ্যান গো কে কোনো নারী সঠিকভাবে চিনতে পারেনি সেদিন । কারণ সময়ের আগে জন্ম নেয়া প্রতিভাধর মানুষকে বোঝার ক্ষমতা, তার সমসাময়িকদের মধ্যে থাকে না । তবে আর ভিনসেন্টের মৃত্যুর শত বছর পরেও তিনি হয়েছেন শত শত রমণীর প্রেরণা ও ভালোবাসার কেন্দ্র । সেই অর্জন গুটি কয়েক সাধারণ রমণীর ভালোকবাসা পাবার থেকে শত গুনে বেশী ।

‘সূর্যমুখ’
সূর্যমুখী, ভিনসেন্ট ভ্যান গো, ১৮৮৮

ভিনসেন্টকে মনে করা হতো, শিশু সুলভ একজন মানুষ, যে সমাজের বাকি দশজন মানুষের মতো চিন্তা করতে জানেতা না, যার কোনো বৈষয়িক জ্ঞান ছিলো না, লোভ বা লালসা কোনোটাই তাঁর ছিলো না । সে মানুষকে চিনতে বা বুঝতে পারতো না সঠিক ভাবে । থিও কে সে একবার চিঠিতে লিখেছিলো যে “সম্পর্কতো শুধু নেবার জন্য নয় দেবার জন্যও” । ভিনসেন্ট সব সময় সব ক্ষেত্রে নিজেকে উজাড় করে দিতে চেয়েছিলেন । তাঁর সাথে কয়েকজন পেশাদারী পতিতার সম্পর্কের কথাও জানা যায় । তাদের মধ্যে সিন হুরনিকের নাম সব থেকে পরিচিত । ১৮৮১-১৮৮৩ সালের মধ্যেকার ঘটনা । ভিনসেন্ট ভ্যান গো এর অনেক শিল্পকর্মে আমরা সিন হুরনিক কে দেখতে পাই । তিনি তার কাজের মডেল হিসেবে তাকে ব্যবহার করেছেন । সিন হুরনিক তখন অন্তসত্বা ছিলো, এক পর্যায়ে ভিনসেন্ট সিন হুরনিক এর সাথে এক সাথে বসবাস শুরু করেন । পরবর্তিতে সিন হুরনিক এর একটি পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে এবং আমরা সেই শিশুটিকেও ভিনসেন্টের কাজে দেখতে পাই । পাগলাটে শিল্পী পরিবার ও সমাজের বিরুদ্ধে গিয়েও  সেই শিশু এবং তার পাঁচ বছরের একটি বোন সহই সিনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, অবশেষে ভাই থিও এর অনুরোধে সে সিন হুরনিককে পরিত্যাগ করে; একি সথে অবসান হয় ভিসেন্টে একমাত্র সংক্ষিপ্ত সংসার জীবনের ।“ হ্যা আমি একটা বেশ্যা ! – আমার সাথে জীবন কাটানো আর নদীতে ঝাপ দেয়া একি কথা ।” বলেছিলো সিন হুরনিক ভিনসেন্ট কে ।

ভিনসেন্টের আঁকা রেখা চিত্র, ‘দু:খ’ সিন হুরনিককে  (১৮৫০-১৯০৪)তিনি মডেল হিসেবে ব্যাবহার করেছেন, মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট, নিউ ইয়র্ক, আলোকচিত্র : আসমা সুলতানা
ভিনসেন্টের আঁকা রেখা চিত্র, ‘দু:খ’ সিন হুরনিককে (১৮৫০-১৯০৪)তিনি মডেল হিসেবে ব্যাবহার করেছেন, মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট, নিউ ইয়র্ক, আলোকচিত্র : আসমা সুলতানা

ধীরে ধীরে ভিনসেন্ট নিজ ভাগ্যের মানচিত্রটা পড়তে পেরে, মেনে নিতে বাধ্য হন যে নারী জাতির মন যখন ঈশ্বরও বুঝতে পারেনি তখন সে আর বৃথা চেষ্টা না করে, মনোযোগ দিতে শুরু করেন পড়াশুনা ও শিল্পচর্চাতে । যাযাবরের মতো ঘুরে দেখতে থাকেন চারপাশের জগতটাকে। নিজেকে সম্পূর্ণরুপে সমর্পণ করেন প্রকৃতির কাছে । এবং শিল্পের কাছেও আত্ম সমর্পণ করেন তিনি। অতঃপর মাত্র দশ বছরের অবিরাম চেষ্টায় তিনি নিজেকে বিশ্বের প্রথম সারির শিল্পীদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন । তাঁর সৃষ্ট ‘সূর্যমুখী’ বিশ্বের সবথেকে জনপ্রিয় শিল্পকর্ম  বলে বিবেচিত আজকের দিনে ।

ভিনসেন্ট এর আঁকা তার মায়ের প্রতিকৃতি, ১৮৮৮, ক্যানভানে তৈলচিত্র
ভিনসেন্ট এর আঁকা তাঁর মায়ের প্রতিকৃতি, ১৮৮৮, ক্যানভানে তৈলচিত্র

শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গো কেনো পাগলের মতো রমণীদের ভালোবাসা পাবার জন্য ছুটেছেন? কেনোইবা তিনি হাহাকার করতেন, কোনো কোমলমতি নারীর স্পর্শের জন্য । খুব সংক্ষিপ্ত করে বললে বলতে হবে, শৈশব থেকে ভিনসেন্ট ছিলেন মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত । ভিনসেন্ট এর জন্মের ঠিক এক বছর আগে তাঁর এক ভায়ের জন্ম হয়েছিলো এবং সে শিশু অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে । তার নামও ছিলো ভিনসেন্ট। এ কথা জানার পর থেকেই ভিনসেন্ট নিজেকে, মনে মনে দায়ী করতেন সে ঘটনার জন্য। শুধু তাই নয়, ভিনসেন্ট তাঁর মায়ের কাছ থেকে কোনো স্নেহ বা ভালোবাসা না পেয়ে ধীরে ধীরে দূরে সরে আসেন । এবং আমৃত্যু তিনি একটি কথাই বোঝার চেষ্টা করেন সেটা হলো, কেনো তাঁর মা, তাঁর শিল্পকর্মকে ‘দু:সহনীয়’ বলেছিলো এবং কোনো দিনো কোনো প্রশংসা করেননি। ভিনসেন্ট ভ্যান গো এর সাথে তাঁর মায়ের সম্পর্কের দূরত্ব ছিলো সারাটি জীবন; তাই ভিনসেন্ট রমণীর ভালোবাসা, মমতা, স্নেহ, আদর পাবার জন্য ব্যাকুল ছিলেন । ভিনসেন্ট এর আয়ু মাত্র ৩৭ বছর হলে কি হবে, তাঁর মা তিন পুত্র সন্তানের অকাল মৃত্যুর পরেও দীর্ঘদিন বেঁচে ছিলেন ।

জোয়ানা ভ্যান গো (১৮৬২-১৯২৫)এবং তার শিশু পুত্র উইলিয়াম
জোয়ানা ভ্যান গো (১৮৬২-১৯২৫)এবং তার শিশু পুত্র উইলিয়াম

যে নারীটির অবদানের কথা না বললে অসম্পূর্ন থেকে যাবে সে হলো – জোয়ানা ভ্যান গো । ভিনসেন্টের ছোটো ভাই থিও ভ্যান গো এর স্ত্রী ও সন্তানের মা । জোয়ানার সঙ্গে ভিনসেন্টে এর সম্পর্কের ব্যাপ্তি খুব সংক্ষিপ্ত কালের । কিন্তু এর স্থায়িত্ব আজীবনের । জোয়ানা যদিও ছিলেন তাঁর ছোটো ভাই এর স্ত্রী, তবুও ভিনসেন্টের সাথে ছিলো তার বন্ধুর মতো সম্পর্ক । এক পর্যায়ে জোয়ানাই নেন ভিনসেন্টে এর মায়ের স্থান, বোনের স্থান বা সহধর্মিনীর স্থান । জোয়ানা তার শিশু পুত্রকে বুকে নিয়ে, ভিনসেন্টের শিল্পকর্ম আকড়ে ধরে, থিও ও ভিনসেন্টে এর চিঠি পত্রগুলোকে আগলে রেখে সামনে এগিয়ে গেছেন এবং ভিনসেন্টের মৃত্যুর ১৬ বছর পরেও হলে তাকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করেই তবে ক্ষান্ত হয়েছেন । যে সব রমণীরা ভিনসেন্টে ফিরিয়ে দিয়ে নারী জাতির কলঙ্ক হয়ে রয়ে গিয়েছিলো, জোয়ানা এক হাতে সেই দাগ মুছে দিয়েছিলেন । আর শিল্পকলার জগতের আকাশে আমাদের উপহার দিয়েছেন একটা উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ।

তারপরেও ভালোবাসা বেঁচে থাকে । শিল্পীরা প্রেমে পড়ে, সৃষ্টি করে অনবদ্য সব সৃষ্টিকর্ম । মানব বা মানবীর প্রতি প্রেম শিল্পীর জীবন কে লন্ডভন্ড করে দিলেও সৃষ্টির প্রশ্নে ও সৃজনশীল চর্চায় সে থাকে অনঢ় এবং অবিচল । আত্মসমর্পণে শিল্পী নিজেকে ভাসিয়ে দেয় না সমাজ সংসারের চিরয়াত সংস্কারের মাঝে । সে ভেসে চলে ভিন্ন স্রোতে । একা। বিচ্ছিন্ন ভাবে । তার চলার সঙ্গি তার হৃদয় মাঝে বয়ে চলা ভালোবাসার ঝর্নাধারা । ভালোবাসা ও প্রেমই তার সৃষ্টিশীলতার চালিকা শক্তি । ভিনসেন্ট ভ্যান গো যেমনটি বলেছিলেন – “ অনেক কিছুকে একসঙ্গে ভালোবাসা ভালো, ভালোবাসার মধ্যেই শক্তি লুকিয়ে থাকে, যে বেশী ভালোবাসতে জানে সে বেশী পরিশ্রম করতে পারে এবং বেশী অর্জন করতে পারে এবং ভালোবাসায় যে কাজ করা হয় তা হয় সর্ব শ্রেষ্ঠ’’।

রনের উপরে নক্ষত্র রাত, ১৮৮৮, ক্যানভাসে তৈলচিত্র
রনের উপরে নক্ষত্র রাত, ১৮৮৮, ক্যানভাসে তৈলচিত্র

(চলবে…)

দর্শনের সহজপাঠ – পর্ব ২ : সত্যিকারের সুখ

Originally posted on জীবনের বিজ্ঞান :

অ্যারিস্টোটল ( ৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)

‘একটি কোকিল মানেই বসন্ত নয়’ – আপনি ভাবতেই পারেন এমন কোন বাক্য হয়তো এসেছে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার অথবা অন্য কোন মহান কবির কবিতা থেকে। শুনলেও মনে হয় সেটাই তো হওয়া উচিৎ। কিন্তু বাস্তবিকভাবে বাক্যটিকে আমরা খুজে পাবো ‘দি নিকোম্যাকিয়ান এথিকস’ নামে অ্যারিস্টোটল এর একটি বইতে। বইটির নাম এরকম হবার কারণ এটি অ্যারিস্টোটল উৎসর্গ করেছিলেন তার ছেলে নিকোম্যাকাসকে। তিনি এই বাক্যটির মাধ্যমে যা বোঝাতে চাইছিলেন সেটি হচ্ছে, বসন্ত কিংবা গ্রীষ্ম এসেছে সেটি প্রমান করার জন্য একটি মাত্র কোকিলের আগমনের চেয়েও আরো বেশী কিছুর প্রয়োজন আছে এবং একটি উষ্ণ দিন, বা অল্প কিছু মহুর্তের আনন্দ আর সত্যিকারের সুখ কিন্তু এক নয়। অ্যারিস্টোটলের কাছে সুখ মানে ক্ষনিকে জন্য অনুভূত আনন্দের কোন বিষয় ছিল না। বিস্ময়করভাবে, তিনি ভাবতেন যে, শিশুরা কখনোই সুখী হতে পারেনা। এই কথাটি আমাদের কাছে খুব অদ্ভুত শোনায়, কারণ যদি শিশুরাই সুখী হতে না পারে, তাহলে কে পারে? কিন্তু তার এই প্রস্তাবটি স্পষ্ট করে সুখ সম্বন্ধে তার দৃষ্টিভঙ্গিটি…

View original 1,838 more words

দর্শনের সহজপাঠ – পর্ব ১ : যে মানুষটি শুধু প্রশ্ন করতেন..

Originally posted on জীবনের বিজ্ঞান :

সক্রেটিস

প্রায় ২৪০০ বছর আগে এথেন্সে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল অতিরিক্ত বেশী প্রশ্ন করার জন্য। তার আগেও বহু দার্শনিকরা ছিলেন ঠিকই, কিন্তু সক্রেটিস এর হাত ধরেই এই দর্শন বিষয়টি সত্যিকারভাবে যাত্রা শুরু করেছিল। দর্শনের যদি কোন পৃষ্ঠপোষক সেইন্ট থেকে থাকেন, তিনি হলেন সক্রেটিস।

চ্যাপটা নাক, মোটা,বেঁটে, অগোছালো, নোংরা এবং বেশ অদ্ভুত প্রকৃতির সক্রেটিস সেই সমাজে ঠিক মানানসই ছিলেন না। যদিও শারীরিকভাবে তিনি কুৎসিত ছিলেন, প্রায়ই তিনি গোছল করতেন না, তবে তার ব্যক্তিত্বে ছিল অদ্ভুত একধরনের আকর্ষনীয়তা এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর মেধার অধিকারী ছিলেন তিনি। এথেন্স এর সবাই একমত ছিলেন অন্তত একটা বিষয়ে, তার মত এমন কাউকে আর কখনোই দেখা যায়নি এর আগে এবং সম্ভবত আর কখনোই দেখা পাওয়া যাবেনা। তিনি খুবই অনন্য একজন ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু একই সাথে তিনি ছিলেন খুবই বিরক্তিকরও। তিনি নিজেকে দেখতেন ঘোড়া বা গবাদীপশুর গায়ে কামড়ানো বিরক্তিকর মাছি, গ্যাডফ্লাই বা গোমাছির মত। তারা বিরক্তিকর তবে বড় কোন ধরণের ক্ষতি করেনা। তবে এথেন্সের সবাই অবশ্য তা…

View original 2,284 more words

অবশেষে….. দুটো বই প্রকাশিত..

Asma Sultana:

When love and skill work together, expect a masterpiece. – John Ruskin

Originally posted on জীবনের বিজ্ঞান :

boiছবি কৃতজ্ঞতা: লিপন মুস্তাফিজ

পাওয়া যাচ্ছে অনার্য প্রকাশনীর স্টলে..(১৯৭-১৯৮)

View original

মানুষ, সব কিছুর মানদন্ড যে : দ্বিতীয় পর্ব

Originally posted on জীবনের বিজ্ঞান :

কেনেথ ক্লার্ক এর ‘সিভিলাইজেশন’ এর চতুর্থ অধ্যায় ম্যান দি মেজার অফ অল থিংস এর অনুবাদ প্রচেষ্টা..

(আসমা সুলতানা ও কাজী মাহবুব হাসান)

মানুষ, সব কিছুর মানদন্ড যে : প্রথম পর্ব
মানুষ, সব কিছুর মানদন্ড যে : দ্বিতীয় পর্ব

বতিচেল্লী, সেইন্ট অগাস্টিন

ফ্লোরেন্সে পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ত্রিশ বছর ছিল জ্ঞানার্জণের জন্য একটি বীরোচিত পর্ব, যখন নতুন নতুন গ্রন্থের সন্ধান মিলেছে এবং সম্পাদিত হয়েছিল বহু প্রাচীন গ্রন্থ, যখন বিদ্বানরা ছিলেন শিক্ষক, শাসক আর নৈতিকতার পথপ্রদর্শক। রেনেসাঁ পর্বে অসংখ্য চিত্র আছে যেখানে বিদ্বানরা তাদের অধ্যয়নের নিমগ্ন, সাধারণত বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই যার প্রতিনিধিত্ব করতো খ্রিস্টীয় চার্চের অন্যতম পিতাদের কোন একজন, জেরোম (১)  অথবা অগাস্টিন (২)। তাদের দেখে মনে হয় তাঁরা বেশ স্বাচ্ছন্দে বসে আসছেন আসবাবপত্রে সুসজ্জিত অধ্যয়ন কক্ষে, যেখানে তাকের উপর জড়ো হয়ে আছে তাদের বই, সেগুলোর পাঠ্যাংশ উন্মুক্ত হয়ে আছে তাদের সামনে। মহাবিশ্ব সম্বন্ধে তাদের গভীর ধ্যানে সহায়তা করছে স্বর্গীয় গোলক। বতিচেল্লীর (৩) সেইন্ট অগাষ্টিন এ যে তীব্র আবেগময় ব্যগ্রতা আমরা দেখি…

View original 1,651 more words