দি থিংকার

সত্তরের  দশকে ইংরেজি শিল্পসমালোচক জন পিটার বার্জারের তৈরী ওয়েজ ওফ সিইং ’ (Ways of Seeing) নামের বিবিসি টেলিভিশনের ধারাবাহিক অনুষ্ঠানটি (পরবর্তীতে যা বই আকারে বের হয় ) শিল্পকলাকে পযর্বেক্ষনের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী প্রক্রিয়ার পথ দেখিয়েছিল। এবং যা  শিল্পরসিকদের শিল্পকর্ম দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে   চিরস্হায়ী প্রভাব ফেলে। আমাদের চোখের দেখা ও জানার র্পাথক্য যে কত ব্যাপক হতে পারে তা হয়তো কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছিলাম, বছর কয়েক আগে, প্যারিসের আধুনিক শিল্পকলার মিউজিয়াম ‘মিউজে ডে ওরসে ’ (Musee d’Orsay) – তে গিয়ে।

Continue reading

Ways of Seeing

((((( বাংলাভাষায় শিল্পকলার ইতিহাস, নন্দনতত্ব বা শিল্পসমালোচনা নিয়ে জানার পরিসর অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। জানার অসীম আগ্রহ নিয়ে খুঁজে বেড়িয়েছি, কিন্তু শিল্পকলার ব্যাপকতা নিয়ে আমার যে জ্ঞানতৃষ্ণা তা মেটাতে পারে এমন কোনো বইয়ের সন্ধান মেলেনি। একজন শিল্পী হিসেবে, সেই ঘাটতি পুরনের প্রচেষ্টায় অনুবাদ একটা বিশেষ ভুমিকা রাখতে পারে বলে আমার ধারণা। সেই কথা মাথায় রেখেই ইংরেজ শিল্পসমালোচক জন বার্জারের ওয়েজ ওব সিইং  বইটা অনুবাদ করা অত্যন্ত আবশ্যিক বলে আমি বিশ্বাস করি। সেই গুরু দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছি। আর সম্পাদনার কঠিন দায়িত্বটি সম্পন্ন  করবেন কাজী মাহবুব হাসান।  শিল্পকলার অনুরাগীদের জানার তৃষ্ণা সামান্য হলেও মেটাতে যদি সক্ষম হই অথবা পাঠকদের ভালো লাগার উপরেই  র্নিভর করছে আমাদের শ্রমের সাফল্য।

ইংরেজ শিল্পসমালোচক জন বার্জারের ওয়েজ ওব  সিইং  শিল্পকলার ইতিহাসে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছিল,আমাদেরকে যা দেখতে শিখিয়েছে নতুন ভাবে; বি বি সি টেলিভিশনে ধারাবহিকভাবে প্রচারিত হওয়া এই অসাধারণ প্রামান্য অনুষ্ঠানটির দর্শকপ্রিয়তা পরবর্তীতে অনুপ্রানিত করেছিল, ওয়েজ ওব সিইং  এর একটি স্বতন্ত্র বই হিসাবে আত্মপ্রকাশের। মোট পাচঁ জনের ( জন বার্জার, স্ভেন ব্লুমর্বাগ, ক্রিস ফক্স, মিশেল ডিব, রির্চাড হলিস) সম্পাদনায় এটি বই আকারে  প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭২ সালে। ))))

ওয়েজ   ওব সিইং : জন বার্জার


ছবি: দি কী অব ড্রিমস, রেনে ম্যাগরিট (১৮৯৮-১৯৬৭)

শব্দ ব্যবহারের আগেই আমরা দেখতে শিখি। শিশুরা কথা বলার আগে প্রথমে দেখতে শেখে, তারপর চিনতে শেখে।

কিন্তু আরো একটি অর্থ আছে, যেখানে দেখাটা শব্দের আগেই আসে। এই দেখাটাই  চারপাশের পরিবেশে আমাদের অবস্থানটাকে প্রতিষ্ঠিত করে; পৃথিবীকে আমরা ব্যাখ্যা করি শব্দ দিয়ে, কিন্তু শব্দগুলো সেই সত্যটাকে অনিষ্পন্ন করতে পারেনা যে, আমাদের চারপাশে এর অবস্থান। আমরা যা দেখি আর আমরা যা জানি এ দুয়ের মধ্যে সম্পর্ক এখনও অমীমাংসিত। প্রতি সন্ধ্যায় আমরা দেখি সুর্য অস্ত যাচ্ছে। আমরা জানি যে পৃথিবী সুর্য থেকে দুরে সরে যাচ্ছে। তারপরও এই জ্ঞানটি, ব্যাখ্যাটি কখনোই  পুরোপুরি আমাদের দেখা এই দৃশ্যটির সাথে ঠিক খাপ খায় না। পরাবাস্তববাদী শিল্পী ম্যাগরিট কোন একটি পেইন্টিং এ এই শব্দ এবং দেখার মধ্যবর্তী এই চিরন্তন ব্যবধানটিকে বলেছেন, স্বপ্নের চাবি।

আমরা কোন কিছুকে যেভাবে দেখি তাকে প্রভাবিত করে আমরা কি জানি বা আমরা কি বিশ্বাস করি। মধ্যযুগে মানুষ যখন নরকের বাস্তব অস্তিত্বে বিশ্বাস করতো, সেই সময়ে আগুনের দৃশ্যের অর্থ অবশ্যই বর্তমানে এর যা অর্থ, তার তুলনায় ভিন্ন ছিল। যাইহোক নরকের ধারনাটি আগুনের কোন কিছু গ্রাস করা এবং শুধু মাত্র ভস্মাবশেষ রয়ে যাওয়ার দৃশ্য-এছাড়া তাদের দগ্ধ হবার যন্ত্রনার অভিজ্ঞতার কাছেও অনেকাংশেই ঋণী।

যখন আমরা ভালোবাসি, ভালোবাসার মানুষটির মুখচ্ছবির যে পরিপুর্ণতা আছে, যা কোন শব্দ বা কোন আলিঙ্গন, যার সমতুল্য হতে পারেনা;  এই পরিপুর্নতাকে শুধুমাত্র সঙ্গমই পারে সাময়িকভাবে জায়গা করে দিতে।

তারপরও এই দেখা, যা শব্দের আগেই আসে এবং কখনোই ঠিক শব্দ দিয়ে যা প্রতিস্থাপন করা যায় না। যান্ত্রিকভাবে কোন উত্তেজনার প্রতি প্রতিক্রিয়ার প্রশ্নই শুধু নয় এটি ( একে  শুধুমাত্র এই ভাবেই ভাবা সম্ভব যদি কেউ চোখের রেটিনার ক্ষুদ্র একটা প্রক্রিয়াকে শনাক্ত করতে পারে। ) আমরা শুধুমাত্র যে দিকে তাকাই আমরা শুধু তাই দেখি। কোন কিছুর দিকে তাকানো আমাদের ইচ্ছার অধীনস্থ একটি কাজ। এবং এই কাজটির ফলাফলে আমরা যা দেখি তা আমাদের নাগালের মধ্যে চলে আসে-যদিও এর অর্থ অবশ্যই আমাদের হাতে নাগালের মধ্যে না। কোন কিছুকে স্পর্শ করা মানে, তার সাপেক্ষে কারো অবস্থানকে চিহ্নিত করা (চোখ বন্ধ করুন, এভাবে ঘরের মধ্যে হাটা চলা করার চেষ্টা করুন, লক্ষ্য করে দেখুন, আমাদের স্পর্শ করার ক্ষমতা, স্থির, সীমিত আকারের দৃষ্টি ক্ষমতার মত)। আমরা কখনো শুধুমাত্র একটা জিনিসের দিকে তাকাই না; কোনকিছু এবং আমাদের নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কের দিকেই আমরা সবসময়ই তাকাই। আমাদের দৃষ্টি অবিরাম সক্রিয়, অবিরাম গতিশীল, অবিরাম এর চারপাশের বৃত্তের মধ্যে আটকে রাখে সবকিছু, আমরা যেমন, তেমনই যা আমাদের কাছে যা বর্তমান তাকেই গঠন করে।

(চলবে)