‘আলকেমি অব লসেস’

frontpage.jpg

বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত ব্রিটিশ শিল্পী আসমা সুলতানার একক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলকেমি অব লসেস’ সমাপ্ত হলো কলাকেন্দ্রে। শিল্পীর জীবনের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই প্রদর্শনীটি চলেছে ৩রা ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ই ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা।

গত ৩রা ফেব্রুয়ারীতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরস্থ কলাকেন্দ্রে (১/১১, ইকবাল রোড, চতুর্থ তলা) শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান ও কেহকাশা সাবা এর কিউরেশনে আয়োজিত এই প্রদর্শনীর অনাড়ম্বর উদ্বোধনী দিনটিতে উপস্থিত ছিলেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পী নেসার হোসেন, শিশির ভট্টাচার্যসহ অন্যান্য শিল্পী ও শিল্পবোদ্ধা, আইনজ্ঞ ফজলে কবির ও মোহাম্মদ সাইফুল আলম, শিক্ষাবিদ ডায়ানা আনসারী সহ নানা স্তরের শিল্পপ্রিয় দর্শক ও শুভান্যুধায়ীরা। ১৭ই ফেব্রুয়ারী ছিল শিল্পীর ভাষণ ও দর্শনার্থীদের সাথে স্বতঃস্ফূর্ত কথোপকথন ‘আর্টিস্ট টক’।
বর্তমানে কর্মসূত্রে কানাডায় বসবাসরত আসমা সুলতানার এটি দেশ ও দেশের বাইরে মিলিয়ে ৬ষ্ঠ একক প্রদর্শনী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পরে লন্ডন ও টরেন্টো তে শিল্পকলা ও শিল্পকলার ইতিহাস বিষয়ে প্রশিক্ষিত হয়েছেন। জ্ঞান অন্বেষণের নিমিত্তে ও শিল্পের কসমিক অস্তিত্বের মাঝে তিনি নিজেকে ও নিজের সৃষ্টিকর্মের আত্মজৈবনিক সম্পর্ক খুঁজতে বিভিন্ন দেশের আর্ট -মিউজিয়ামে ঘুরে ফিরেছেন। কানাডা, ইংল্যান্ড, ভারত ও বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অনেকগুলো গ্রুপ প্রদর্শনীতে তিনি অংশগ্রহন করেছেন তার অনন্য শিল্পকর্ম উপস্থাপনের মাধ্যমে।

dsc_0053

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের পারিবারিক সামাজিক রাজনৈতিক সম্পর্কের বিচ্ছিন্ন বিক্ষেপে শিল্পী হিসেবে বেড়ে ওঠার সংগ্রামে স্বতন্ত্রতা, প্রবাসের ভিন্নআঙ্গিক ব্যক্তিক ও কর্মজীবন অভিজ্ঞান, মুক্ত এক সত্তার মতো নিজের ভৌগোলিক অস্তিত্বের নিয়ত সন্ধান নিয়ে শিল্পীর যে জীবন তার অপ্রাপ্তি-বিসর্জন-আত্মত্যাগ এর যন্ত্রণার নির্যাস দিয়েই তার সকল সুবর্ন সৃষ্টি, যার প্রতিফলন তার এই প্রদর্শনী ‘এলকেমি অফ লসেস’।
প্রতীকীরূপে তিনি তার বিভিন্ন অস্তিত্বকে শিল্পী-অস্তিত্বে নিয়ত একীভূত করার চেষ্টা করে এসেছেন তার ক্যানভাস, প্রিন্ট, স্থাপনা শিল্পে ও কবিতার শব্দে। এই প্রদর্শনীতে তার নিজের চুল দিয়ে সেলাই করা শিল্পকর্মের পাশাপাশি স্থান পেয়েছিলো তার বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ দেয়া ক্যানভাস। অন্তর্ভুক্ত ছিল চুল দিয়ে সেলাই করা ছাদ থেকে মেঘের মত ভেসে থাকা শিশুদের বারোটি জামা, একটি শাড়িকে ভাঁজ করে সেলাই করা ছাদ থেকে নেমে এসে মাটি স্পর্শ করা জরায়ুর রক্তাক্ত দুটি হাতের ছাপসহ দীর্ঘ একটি জামা, হৃদয়-বিদীর্ন করার মতো যন্ত্রণাকে বোঝানোর জন্য চুল গোঁজা হৃৎপিন্ড, চুল আঁচড়ানোর জন্য স্ব-ব্যবহৃত ব্রাশ এর মাঝে কৃত্রিম চুল অপসারণ করে নিজের চুল ও সুই গেঁথে দেয়া ব্রাশ, ভ্রূণ, কাপড়ের খামে প্রজাপতির ভাঙ্গা ডানা, শুকনো বীজের একটি ডাল, সিল্কের ফিতায় চুল দিয়ে সেলাই করা অষ্টাশিটি নক্ষত্রপুঞ্জ। ছিল নিজের অজাত শিশুর শিল্পকর্ম যে অমরার পুষ্টিতে নয় বরং তার সৃজনী-মনের স্বপ্নে আশায় বেড়ে ওঠে শরীরের বাইরে, কাঁথার জমিনে চুলের সেলাইয়ে পেইন্টিংয়ে।

img_0100
প্রবাসে নিজের পথচলায় ও কাজে স্বাধীনতার সন্ধান পাওয়া আসমা সুলতানা নিজের শেকড়ের সাথে সম্বন্ধকে প্রতিফলিত করেছেন আবহমান বাংলার সুচিশিল্পের মাধ্যমে, ফ্রেমে ফ্রেমে তিনি নিজের চুল দিয়েই সেলাই করেছেন চিরায়ত আবেগপ্রিয় ‘ভালোবাসা’ ‘স্বাগতম’ ‘সুখে থেকো’ ‘ভুল না আমায়’ ‘মা’, সেলাই করেছেন নিজ ও নিজের এক প্রিয় বন্ধুর শৈশবমুখ, জরায়ু ইত্যাদি। বৃধাঙ্গুলির ছাপে তিনি তুলে ধরেছেন তার অতীত ও বর্তমান, দেশ দেশান্তরে তার পথচলার স্মৃতি।
শিল্পীর সাথে মুখোমুখি কথা বলার সুযোগ ছিল প্রতিটি দিন, শিক্ষার্থী-শিক্ষক সহ নানান দর্শক ও শুভান্যুধায়ীদের সামনে এক অনন্য কাজ নিয়ে উপস্থিত আসমা সুলতানার ভাষনে, তার সাথে কথোপকথনে বারবার তার স্মৃতি-যন্ত্রনা-বিসর্জনের শিল্পকর্মে রুপান্তরের প্রক্রিয়াটা যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি জাগতিক অস্তিত্বের সবকিছুর সাথে তার সম্পর্ক খুঁজে বের করার যে প্রচেষ্টা তিনি সেই শৈশব থেকে করে এসেছেন তার গুরুত্ব বুঝতে পেরে দর্শকেরা শিল্পীর ভবিষ্যত কাজ সম্পর্কে এক কৌতুহলী আকাঙ্খা পোষন করেছেন। ১৮ই ফেব্রুয়ারী প্রদর্শনীটির শেষ দিনে তিনি শিল্পকলায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নানা মৌলিক ও বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিত উদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর দেন। আসমা সুলতানা তার পরবর্তী প্রদর্শনীর বিষয় হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গনহত্যা নিয়ে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন।


by Hironmoy Golder

Advertisements