মৃত্যু ঘটুক সড়ক দুর্ঘটনার: মানুষের মৃত্যু হোক প্রকৃতির নিয়মে

দৃশ্য এক:

বাংলাদেশের বাইরের ঘটনা। ২০১৫ সালের ২০ জানুয়ারী শীতের সন্ধ্যা বেলা। রাস্তাঘাট তুষারে ঢাকা না থাকলেও গলে যাওয়া তুষারের আভাস তো আছেই। শীতের শীতলতায় জমে আছে সব কিছু। কিছুদিন আগেই ক্রিসমাস গেলো, ছুটির আমেজ কাটেনি তাই জানুয়ারী মাসের ট্রাফিক খুব একটা ব্যস্ত না হলেও খুব একটা নিরিবিলিও না। এমন সময় একজন চালক হঠাৎ করে নিজেকে আবিষ্কার করলেন, সে তার গাড়ী সহ, ঢালু কোনো জায়গা থেকে গড়িয়ে পড়ছেন। গড়াতে গড়াতে নীচের দিকে নেমে যাচ্ছেন। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বা খেয়াল করেননি। হয়তোবা তীব্র একটা বিকট শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন বলে চমকে উঠে ব্রেক ফেইল করে রাস্তার পাশের ঢালুতে গড়াতে থাকেন। কোনটা সত্যি বলা মুশকিল, কারণ সেই দুর্ঘটনার পরে, তার আর কিছুই মনে নেই।

সিটবেল্ট বাধা থাকলেও, গাড়ীর ঘূর্ণায়মান আবস্থায় মহাসড়কের পাশের গ্রিলে বাড়ি লেগে গাড়ীর গ্লাস ভেঙ্গে চালক মারাত্মক ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। জানালার কাঁচ থেকে চালক নিজের মাথা রক্ষা করতে  হাত উঁচিয়ে মাথা ঢেকে রাখলেও মাথা ও হাত বাঁচাতে পারলেন না শেষপর্যন্ত । গাড়ীর গ্লাসে তার হাত কেটে যায়, মাংস খুবলে উঠে যায় হাতের আঙ্গুল থেকে এবং মাথার  মধ্যে অসংখ্য কাঁচের টুকরো ঢুকে যায়। অবশেষে গাড়ী যখন মাটিতে নেমে স্থির হলো তখন, তার হাত ও মাথা রক্তে ভিজে গেছে। এমনকি তার গায়ের শীতের জ্যাকেটটিও ভিজে গেছে রক্তে। চালক ততক্ষণে নিজেকে মৃত বলে ধরে নিয়েছেন, কারণ এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব না। হঠাৎ তিনি শুনতে পান, অনেকগুলো মানুষের কণ্ঠস্বর। সে গাড়ী থেকে কোনো মতে বের হতে পারলে, আনেক গুলো উদ্বিগ্ন মানুষ জিজ্ঞেস করে, সে ঠিক আছে কিনা? সেই ভিড়ের মধ্যে একজন তাকে জানালো যে পুলিশ ও প্যারামেডিকসকে ফোন করা হয়ে গেছে এবং তারা আসছে। তাদের ইচ্ছা থাকলেও সাহায্য করার উপায় নেই, কারণ এটা, দুর্ঘটনা, পুলিশ কেইস। এসব দেশে যে কোনো ধরনের দুর্ঘটনায় পুলিশের দায়িত্ব সবার আগে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করবার। সেই ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন আঘাতপ্রাপ্ত চালককে পানি পান করালেন। চারপাশের মানুষগুলো আর কেউ না, তারা সবাই খুব সাধারণ মানুষ, সবাই গাড়ীর চালক। সবাই তাদের যাত্রা থামিয়ে দুর্ঘটনা কবলিত চালককে সাহায্য করতে ছুটে এসেছেন। সেই চালক একজন বাংলাদেশী। তার চারপাশের মানুষ গুলোর সবাই ভিন্ন ভিন্ন জাতি সত্তার। তিনি কানাডার কোনো একটি শহরে এই দুর্ঘটনার কবলে পড়েন । তবে তিনি কারো দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হননি বা তিনি কাউকে আঘাতও করেননি। খুব অজানা একটি কারণে তিনি এই দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। কিন্তু তার চারপাশের মানুষগুলো যা করলো; একটি সভ্য দেশের সভ্য মানুষদের আচরণ এমনই হওয়া উচিৎ। কিছুক্ষণ পরেই চালককে তুলে নিয়ে যায় প্যারামেডিকেস এ্যাম্বুলেন্স, তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে কয়েকঘন্টা পরে ছেড়ে দেয়া হয়। এবং পরবর্তীতে নার্স এসে নিয়মিত ড্রেসিং করে ও পরিচর্যা করে এবং তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা হয়। আর দুর্ঘটনার পরপরই গাড়ীটিকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় ট্রাফিক পুলিশ, দ্রুত পরিষ্কার করে ফেলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া দুর্ঘটনার যাবতীয় চিহ্ন । বাকি সবাই স্বাভাবিক জীবন যাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে পুরো ঘটনার মধ্যে যদি কোনো পক্ষের দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থাকতো তবে, যে কেউই অভিযোগ জানাতে পারতেন, সেই পথ খোলা থাকে এদেশে।

দৃশ্য দুই:

২৭ সেটেম্বর ১৯৯৮ সাল, ঢাকা, বাংলাদেশ। ৯৮ সালের বন্যার ভয়াবহতা অনেকেরই হয়তো মনে থাকবে। সে সময় বন্যার কারণে দেশের অনেক স্থানের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বা বিঘ্নিত হয়। বাসাবো থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করাটা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিলো বলে ছেলেটি ইন্দিরা রোডে ছোট বোনের বাসায় কিছুদিনের জন্য আশ্রয় নেয় । সামনে একটি প্রদর্শনী আয়োজনের জন্য, কিছু কেনাকাটা করবার জন্য সে, দুপুর দুইটার দিকে  ফার্ম গেটের দিকে পা বাড়ায়। হয়তো কোনো রিক্সা পায়নি বলে হেঁটেই চলছিলো। হঠাৎ একটি দ্রুতগামী প্রাইভেট কার এসে তার পায়ের পেছনে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। গাড়ীটি যখন তাকে ধাক্কা দিয়েছিলো তখন সে নাকি অনেকটা উঁচুতে শূন্যে উঠে যায়। আশেপাশের সবাই ভেবেছিলো এফ. ডি. সি’র কোনো সিনেমার স্যুটিং চলছে হয়তো। কিন্তু আশেপাশে কোনো ক্যামেরা না দেখতে পেয়ে তারা ছুটে আসে, ছেলেটিকে সাহায্য করতে। যদিও পাশেই দাড়িয়ে থাকা কর্তব্যরত পুলিশ সাধারণ মানুষকে কাছে আসতে বাধা দেয়। কিন্তু ২৪ বছরের সেই যুবক মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে রাস্তায়। তার মস্তিক থেকে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে অনবরত। একজন ছাত্রী অবস্হানরত পুলিশটিকে অনুরোধ করে, যাতে যুবকটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে । কিন্তু পুলিশটি অজুহাত দেয় এখন তার বদলির সময় বলে, অন্য একজন পুলিশ আসবে ‍দায়িত্বপালনে। কয়েকজন মানুষ অটো রিক্সা থামানোরও চেষ্ট চালায় কিন্তু গাড়ী জমা দিতে হবে বলে কেউ রাজি হয়নি ঢাকা মেডিকেলের দিকে যেতে। তাছাড়া ঢাকা তখন এত ব্যস্ত ছিলো না। আর আগেই বলেছি বন্যার কারণে সব কিছু ধীরগতিতে চলছিলো। যুবকের রক্ত কিন্তু ঝরছেই। শেষে সেই ছাত্রীটি নিজেই উদ্যোগী হয়ে যুবকটিকে নিয়ে যায় ঢাকা মেডিকেলে।

যে চালক এই যুবকটিকে ধাক্কা মেরে পালিয়ে গেলো, তারা উচিৎ ছিলো গাড়ী থামিয়ে দেখা যে দুর্ঘটনা কবলিত ব্যক্তিটির ক্ষতির পরিমান কতটুকু বা তার কোনো সাহায্য লাগবে কিনা? কারণ চালকের কাছে একটি যান আছে, দুর্ঘটনা কবলিত যুবকটির কাছে কোনো বাহন ছিলো না। কিন্তু কাজটি সে করেনি। করলে হয়তো আজ আমরা এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে দেখতাম না। করলে হতো সে নিজেকে মানুষ বলে পরিচয় দিতে পারতো আজ। করলে হয়তো আমরাও আজকে সভ্য দেশের কাতারে দাড়িয়ে মাথা উঁচু করে বলতে পারতাম আমরা মানুষকে মানুষ বলেই গণ্য করি। কিন্তু তেমনটি হয়নি। হচ্ছে না। পরে জানা যায় সেই ঘাতক চালকটি তখনকার সময়ের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থক এবং নেতৃস্থানীয়, প্রভাবশালী কেউ। সে মাতাল অবস্থায়, জিগ জ্যাগ প্যার্টনে গাড়ী চালাচ্ছিলো বলে জানা যায় নানা সুত্র থেকে । সেই সময় নানা সংবাদপত্রে খবরটি প্রকাশিত হয়েছিলো। তবে বিস্তারিতভাবে কেউ কোনো প্রতিবেদন করেননি, করলে হয়তো মনে থাকতো কারো কারো।

আমরা মনে করতে পারি যে, ‍যুবকটিকে যখন হাসপাতালে আনতে পারা গেছে, তখন হয়তো সে ভালো চিকিৎসা পাবে এবং বেঁচে যাবে। তাও আবার ঢাকা মেডিকেল! নাহ। সেখানেও যুবকটিকে অবহেলা করা হয় অত্যন্ত নির্মমভাবে। কারণ এটা বাংলা সিনেমা নয় যে কেউ দৌড়ে এসে কর্ত্যব্যরত ডাক্তারের পায়ে পড়বে আর সেই ডাক্তার অলৌকিক শক্তির বলে তাকে বাঁচিয়ে তুলবেন। এমন কিছুই ঘটেনি। বাংলাদেশের যেমন বাস্তবতা, যাকে সবাই স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছে, সেই স্বাভাবিকতায় কোনো চিকিৎসক বা নার্স সেই যুবককে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে আসেনি। তবে এসেছিলো সেই ঘাতক চালকটি । না, এমন কিছু ধরে নেবার কোনো কারণ নেই যে সে এসে বাঁচিয়ে ‍তুলেছিলো যুবকটিকে। সে এসেছিলো যুবকটির আইডি কার্ড ও যাবতীয় কাগজপত্র সরিয়ে নিতে এবং যুবকটিকে তার নজরদারিতে রাখতে । সে নীরবে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থেকে, অপেক্ষা করতে থাকে, যুবকটির মৃত্যুর জন্য। যুবকটি ২৫ বছরে পা দিতো ঠিক এক মাস পরে। সেই যুবকটিকে ঘাতক চালক বেওয়ারিশ বলে চালিয়ে দেয় কারণ সে যুবকটির পকেট থেকে আইডি কার্ডটি সরিয়ে রাখে, তার পরিচয় গোপন করে সে।

যুবকটি ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র। রাত নয়টায় যুবকটির মৃত্যু নিশ্চিত হলে, ঘাতক চালক যুবকটির দাফনের ব্যবস্হা করে। তবে এটাই শেষ নয়; এই যুবকটিকে দাফন করবার পরেও তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজনকে কোনো খবর দেয়া হয় না। যুবকটির পরিবার ও বন্ধুরা ২-৩ দিন যুবকটির কোনো খোঁজ-খবর না পেয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। শেষে তাকে পাওয়া যায় খবরের কাগজের পাতায়। তবে ততক্ষণে সব শেষ। সেই যুবকটির পরিবার, আত্মীয় স্বজন, বন্ধুরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে শেষ বিদায়ও জানাতে পারেনি। এর থেকে হৃদয় বিদারক ঘটনা আর কী হতে পারে? সেই যুবকের চারপাশের মানুষগুলো ‘দৃশ্য এক’ এর মতো ছিলো না। তার সব থেকে দুর্ভাগ্য সে এমন একটি দেশে জন্ম গ্রহন করেছিলো, যেখানে মানুষকে মানুষ বলে গণ্য করা হয় না। যে দেশের চালকরা ট্রাফিক আইন মেনে পথ চলে না। পথচারীরাও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। যে দেশে পুলিশ দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানায়। যে দেশে নার্স এবং ডাক্তার রোগীকে সেবা দান থেকে বিরত থাকে কারণ রোগীর সাথে, রোগীর আত্মীয়স্বজন হাসপাতালে বিছানার পাশে না থাকায় । যে মানুষটির ঢাকা শহরে নিজের ঠিকানা রয়েছে, ঢাকাতে যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা, ঢাকাতেই মা-বাবা, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব; সে কিনা শেষ পর্যন্ত হয় বেওয়ারিশ, তার শেষ আশ্রয় হয় আজিমপুরের কবরস্থান। কে চায় এমন দেশের নাগরিক হতে? হয়তো কেউই না। যুবকটি নিজেও চায়নি এই পোড়া দেশে লাশ হয়ে রক্তাক্ত অবস্হায় মুখ থুবড়ে মর্গে পড়ে থাকতে।

শুধুই দেশেকে দোষারোপ করে কোনো ফলাফল অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের প্রিয় দেশকে আমাদের পূর্বপুরুষেরা রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন করেছেন আর পরবর্তীতে আমরা অনেকেই নাগরিক হয়েছি জন্মগতভাবে। রাষ্ট্রকে গড়বার দায়িত্ব রাষ্ট্রের সব নাগরিকদেরই। কিন্তু কিভাবে এবং শুরুটা হবেই বা কবে থেকে? আমাদের দেশের সমস্যার সংখ্যা অগণিত সেটা সবার জানা। সব রাষ্ট্রেরই সমস্যা থাকে। সমস্যার জন্মই হয় সমাধানের জন্যে। তবে আইনস্টাইন যেমন বলেছিলেন সমস্যাগুলো একসময় আমাদের যে চিন্তাগুলো সৃষ্টি করেছিল, সেই একই চিন্তা করে আমরা আমাদের সমস্যাকে সমাধান করতে পারবো না। চিন্তা করতে হবে ভিন্নভাবে। তবে আমাদের দেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা সমস্যাকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করবার কাজে ব্যবহার করে থাকি। আমরা  প্রতিনিয়ত সমস্যাগুলোকে আড়াল করি, লুকিয়ে রাখি। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘Sweep under the carpet’ , ঠিক তেমন আমরা আমাদের সমস্যার ধুলাবালিগুলোকে ঝাড়ু দিয়ে বিবেকের কার্পেটের নীচে জমাতে থাকি। ক্রমাগত সেই প্রক্রিয়ায় এটি একটি হিমালয় পবর্তের রুপ ধারণ করেছে আজ। সেই হিমালয়ের উপরে কার্পেটের উপরে ভাসছি আমরা, সমস্যার পাহাড় থেকে নামতে পারছি না আর ভাবছি আলাদিনের ম্যাজিক কার্পেটে উড়ছি রুপকথার আকাশে। সমস্যার সমাধানগুলো আলাদিনের প্রদীপে হাত বুলালেই হয়ে যাবে। এমনই সহজ। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

জাতি হিসেবে বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন আমরা। বাস্তবতা থেকে বহু দূরে দাড়িয়ে আছি। ২ জুলাইয়ের দ্য ডেইলি স্টারের খবর মতে এবছর ২০১৮ তে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। এই উপচে পড়া জনসংখ্যার দেশে খুব স্বাভাবিক যেনো এই মৃত্যুগুলো । অস্বাভাবিকতাগুলোকে আমরা স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি প্রতিনিয়ত। তবে সব সমস্যার সমাধান একদিনে সম্ভব না। আমরা সবাই জানি সেটা। তবে সমাধান কি আমরা চাই? যদি চাই, তবে একটা বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাধান একদিনে যেমন আসবে না তেমন সমাধানের শুরুটা আশু হওয়া প্রয়োজন। এবং সেই সমাধানটি কার্যকর করা যাবে কিভাবে, সেটা নিয়ে ভাবা উচিৎ। আমরা আশা করি ট্রাফিক আইন মানলেই সমস্যার সমাধান হবে  বা নতুন আইন প্রণয়ন করলে অথবা কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে যাবে। যে আইনগুলো ইতিমধ্যেই প্রণীত আছে এবং ট্রাফিক চলাচলের জন্য যেসব সুবিধাদি আমাদের রয়েছে সেটাকেই আমাদের মেনে চলতে হবে। আমাদের আইনকে শ্রদ্ধা করতে শিখতে হবে এবং সেই শিক্ষার জন্য সবার আগে আমাদের নিজেদের মনকে প্রশিক্ষিত করতে হবে। আমাদের জনসংখ্যার সবাইকে শিক্ষিত হতে হবে। এবং শিক্ষাকে শুধুমাত্র বই এর সেলফে তুলে না রেখে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আমাদের সেই শিক্ষার চর্চা করতে হবে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, আমাদের প্রকৃতি থেকে ও পরিবার-সমাজ থেকেও শিক্ষা নিতে হবে। শিক্ষার জায়গাটা যেনো উন্মুক্ত থাকে সর্বাবস্থায়।

আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজে, প্রতিটি মুহূর্তে মনকে প্রশিক্ষণ করতে হবে, নিজের মনকে বোঝাতে হবে ইতিবাচক যুক্তি দিয়ে আমি কেনো কাজটি করবো এবং তার ফলে কে কে লাভবান হবে। এবং সব কাজেই সর্বদা ধীর স্থির হতে হবে। এবং যে কাজই আমরা করি না কেন, সেটি সঠিকভাবে মনোযোগের সাথে করতে হবে। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে শুধু রাস্তায় নেমেই চাবি দেয়া পুতুলের মত আমরা আইন মানা শুরু করবো বা শৃঙ্খল হয়ে চলাচল করবো কিন্তু দিনের বাকিটা সময় বিশৃঙ্খলভাবে যা ইচ্ছা তাই করে কাটাবো, সেটা অসম্ভব। সুতরাং সবাইকে ঘুম থেকে জেগে একটি নির্দিষ্ট  নিয়মের মধ্যে দিয়ে দিন শুরু করতে হবে এবং সমাপ্ত করতে হবে। প্রত্যেকটি মানুষকে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। অন্য মানুষের জীবনকে মূল্য দিতে শিখতে হবে। এবং এই সব প্রশিক্ষণের জন্য মেডিটেশন বা ধ্যান একটি উপায় হতে পারে মাত্র। আমাদের রাষ্ট্রের জন্য সবার মেডিটেশন করাটি খুবই প্রয়োজন এখন । সর্বোপরি আমাদের সৎ এবং পরিশ্রমী হতে হবে। যাতে আমরা অন্যের জীবন নয় শুধু কাজের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হতে পারি। যদি আমাদের মানব সৃষ্ট বা প্রণীত আইন মানতে কষ্ট হয়, তবে আমরা প্রকৃতির আইন মেনে চলতে পারি। ভালো কাজ করলে ভালো ফল মেলে এবং খারাপ করলে খারাপ। আমাদের শুধু ভালো অভ্যাসগুলোর দাস হতে হবে, নেতিবাজকগুলো বর্জন করতে হবে।আমাদের জন্য কঠিন হলেও বিষয়টা হয়তো খুব সহজ অন্য অনেক দেশের নাগরিকদের জন্য। কানাডিয়ান মনোবিজ্ঞানী জর্ডান পিটারসন তাঁর 12 Rules for Life: An Antidote to Chaos বইতে, প্রথম অধ্যায়ে বলেছেন, “It is for this reason that routine is necessary. The acts of life we repeat everyday need to be automatized. They must be turned into stable and reliable habits, so they lose their complexity and gain predictability and simplicity.”

যদিও জানি অনেকে পাঠকই প্রশ্ন তুলবেন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে তুলনা কিভাবে করলাম। এটা তুলনা নয় এটা একটা উদাহরণ মাত্র যে, এমনটি (দৃশ্য এক) হতে পারে। জানি তারা এ ও বলবেন পশ্চিমা বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের পার্থক্যগুলো, আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং দুর্নীতির কথা আসবে। প্রশাসনের দুর্নীতি আর অদক্ষতার কথা আসবে। এমন বহু ধরনের কথা আমরা গত অর্ধশতক ধরে বলে যাচ্ছি কিন্তু যেটা বলার সেটা বলছি না বা করছি না। সত্যি বলতে কি পশ্চিমা বিশ্বের নাগরিকরাও তাদের অধিকাংশ রাজনীতিবিদদেরকে দূর্নীতিবাজই ভাবে। তবে তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য হলো;  তারা তাদের দেশকে ভালোবাসে এবং ভালোবেসে সততার সাথে তাদের কর্তব্য পালন করে, রাজনীতিবিদদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে না। আমরা নিজের দয়িত্বটুকু এড়িয়ে যাবার জন্য একে ওকে দোষ দিয়ে চলি। দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে আমরা পশ্চিমের কাছ থেকে যা কিছু দৃশ্যমান ও স্পর্শযোগ্য তার সব কিছুই আমদানী করেছি। কিন্তু যা কিছু দৃষ্টিগোচরের বাইরে, যা কিছু অদৃশ্যমান এবং নৈতিক এবং সুন্দর সেসব কিছুকে আমরা পশ্চিমের কাছ থেকে শিখতে পারিনি। যেমন,আমরা তাদের মতো জ্ঞানপিপাসু নই, পরিশ্রমী নই, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিক নই, মানবতাবাদী এবং দেশপ্রেমীও নই। আমরা বাইস্টান্ডার ইফেক্টে সবাই দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখি দুর্ঘটনা-রক্তপাত- মৃত্যু। একজন এগিয়ে আসলে আরো একজন হয়তো আসলেও আসতে পারে, কিন্তু যদি কেউ দুর্ঘটনা কবলিত মানুষটিকে সাহায্য করতে এগিয়ে না আসে তবে কেউই আসবে না। যদিও জনসংখ্যার দিক থেকে আমরা কিন্তু কাঙাল নই। কিন্তু মানবিকতার দিক থেকে তো বটেই। আমরা বাহিরে বাহ্যিকতায় পশ্চিমী ভেক ধরলেও খুব ভেতরে আমরা বাঙালী মধ্যবিত্ত মানসিকতার শিকড়চ্যুত করতে পারিনি। আমাদের মধ্যে প্রিচিং প্রিস্ট (জ্ঞান প্রদানকর্তা) অনেক,  কিন্তু প্র্যাক্টিসিং পার্সন  (কর্তব্য পালনকারী) খুব কম। এই লেখাটি লেখবার সময় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা মনে পড়ে গেলো, ওই যুবকটিরও প্রিয় কবি ছিলো রবীন্দ্রনাথ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বাঙালি জাতিকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লেখায় সমালোচনা করে গেছেন, তিনি আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন বহু আগেই যে, একটি সভ্য সমাজ কেমন আচরণ করতে পারে। তিনি তাঁর ‘জাপান যাত্রী’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন: “একটা জিনিস এখানে পথে ঘাটে চোখে পড়ে। রাস্তায় লোকের ভিড় আছে, কিন্তু গোলমাল একেবারে নেই। এরা যেন চেঁচাতে জানে না, লোকে বলে জাপানের ছেলেরা সুদ্ধ কাঁদে না। আমি এপর্যন্ত একটি ছেলেকেও কাঁদতে দেখি নি। পথে মোটরে করে যাবার সময়ে মাঝে মাঝে যেখানে ঠেলাগাড়ি প্রভৃতি বাধা এসে পড়ে, সেখানে মোটরের চালক শান্তভাবে অপেক্ষা করে; গাল দেয় না, হাঁকাহাঁকি করে না। পথের মধ্যে হঠাৎ একটা বাইসিক্‌ল্‌ মোটরের উপরে এসে পড়বার উপক্রম করলে, আমাদের দেশের চালক এ অবস্থায় বাইসিক্‌ল্‌-আরোহীকে অনাবশ্যক গাল না দিয়ে থাকতে পারত না। এ লোকটা ভ্রূক্ষেপমাত্র করলে না। এখানকার বাঙালিদের কাছে শুনতে পেলুম যে, রাস্তায় দুই বাইসিক্‌লে, কিম্বা গাড়ির সঙ্গে বাইসিক্‌লের ঠোকাঠুকি হয়ে যখন রক্তপাত হয়ে যায়, তখনো উভয় পক্ষ চেঁচামেচি গালমন্দ না করে গায়ের ধুলো ঝেড়ে চলে যায়।” আমি কামনা করি আমাদের দেশেও এমন দৃশ্যের অবতরনা হোক।

যে যুবকটির কথা বললাম দ্বিতীয় দৃশ্যে, সে নিয়মিত মেডিটেশন করতো, ছিলো শান্তিপ্রিয় ও বন্ধুসুলভ। একজন সৎ এবং পরিশ্রমী মানুষ ছিলো সে, ছিলো একজন প্রতিভাবান শিল্পী, ছিলো একজন কবি। আমার সহপাঠী এবং একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড । যে তার জন্ম দিনের ঠিক একমাস আগে অনেক অভিমানে কমলা রঙের রোদের কোনো গ্রহে পাড়ি জমিয়ে ছিলো। কমলা রঙ ছিলো খুব প্রিয় তার। বাতাসের কানে কানে সে বলে গিয়েছিলো, এই মরা দেশে, সে আর বাঁচতে চায় না। যে দেশে বাঁচারই কোনো সুযোগ নেই।

মানুষের মৃত্যু একদিন হবেই। তবে সবার মৃত্যু হওয়া উচিৎ স্বাভাবিক নিয়েমে, প্রকৃতির নিয়মে, আত্মীয় স্বজন পরিবেষ্টিত হয়ে, ভালোবাসা, মমতায়, চোখের জলে। কারো শেষ বিদায় দিনটি যেন এই যুবকটির মতো না হয়। আমরা কামনা করবো মানুষের জীবন হবে নিরাপদ, মানুষের মৃত্যু যেন রাস্তায় না হয়, যেন সড়ক দুর্ঘটনায় না হয়। বরং মৃত্যু হোক সড়ক দুর্ঘটনার।

সেই যুবকটির নাম ইসমত মনি: জন্ম: ২৮ অক্টোবর, ১৯৭৬ (সার্টিফিকেট) এবং মৃত্যু: ২৭ সেটেম্বর ১৯৯৮, ঢাকা বিভাগ, বাংলাদেশ। মৃত্যুর কারণ: সড়ক দুর্ঘটনা এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলা।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s