মোনালিসা

মোনালিসা
১৫০৩-১৫০৫
পপলার কাঠের পাতের উপরে তেল রঙে আঁকা
৩০X২০ ইন্চি
প্যারিসের ল্যুভ যাদুঘরে রাখা

মনে আছে সেই অনুভূতির কথা, যখন প্রথমবারের মত মোনালিসা দেখেছিলাম আমি । অপেক্ষার দেরি সহ্য না হওয়া বা খুজেঁ খুজেঁ  ঠিক কোন ঘরে মোনালিসা রাখা ‍আছে তা বের করার অস্থির মুহুর্তগুলো ।  ভিন্চি’র মোনালিসা পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ মানুষের চোখে সব থেকে বিখ্যাত এবং পরিচিত শিল্পকর্ম । এছাড়াপৃথিবীর  সবচেয়ে আলোচিত, এবং সবচেয়ে  সমালোচিত শিল্পকর্মও মোনালিসা। রেনেসাঁর পুর্নজাগরণের শিল্পী, পৃথিবী যাকে জিনিয়াস বলে জানে সেই লিওনার্দো দা ভিন্চি’র আকাঁ মোনালিসা, কেনো এত বিখ্যাত বা আলোচিত বা সমালোচিত ? এর পেছনে বছরের পর বছর গবেষক, শিল্পী ও শিল্পকলার ইতিহাসের পন্ডিতেরা ব্যয় করে যাচ্ছেন মূল্যবান সময়; নিশ্চয় কারণ আছে !

এই বিখ্যাত শিল্পকর্ম নিয়ে যত কাল্পনিক কাহিনী প্রচলিত আছে তা আর কোনো শিল্পকর্ম সর্ম্পকে নেই । যদি ভিন্চি , ভ্যান গো’র মত তারঁ কাজের সব বর্ণনা লিখে রেখে যেতেন তাহলে আজকে মোনালিসা সৃষ্টির ৫০০ বছর পরেও এত কল্পকাহিনী তৈরী হতো না । যাই হোক , এই সব কল্পকাহিনীও সাধারন মানুষের মনে মোনালিসাকে নিয়ে কৌতুহল এবং আরো জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে । যদিও সবচেয়ে প্রচলিত গুজবটি হচ্ছে, মোনালিসা আসলে ভিন্চির নিজেরই প্রতিকৃতি ।আর হলেই বা তাতে কি এসে যায় ? এতে করে মোনালিসার সৈন্দর্য্য কমবে না এক ফোটাও ।
মোনালিসা রাখা আছে পৃথিবীর সবচেয়ে  বড়  মিউজিয়াম, প্যারিসের ল্যুভ এ । ল্যুভ এর ৬,০০০ শিল্প কর্মের মধ্যে  সব থেকে বিখ্যাত হলো মোনালিসা । প্রশ্ন হচ্ছে ল্যুভ মোনালিসাকে ধারন করে খ্যাতি এনে দিচ্ছে , নাকি  মোনালিসা ল্যুভকে খ্যাতি এনে দিচ্ছে । অবশ্যই মোনালিসা ল্যুভকে আরো খ্যাতি এনে দিচ্ছে । প্রতিদিন শুধুমাত্র মোনালিসা দেখতে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভীড় করছে ল্যুভ এ । শুধুমাত্র মোনালিসা‘র সামনে লম্বা এক লাইন ।  প্রতিটা দর্শক মাত্র ৩০ সেকেন্ড করে সময় পায় এই বিখ্যাত শিল্পকর্মটি দেখতে । ঠিক ২০০৫ এ আমি যখন মোনালিসা দেখার সুযোগ পাই, এর পরপরই এপ্রিলের ৪ তারিখে মোনালিসাকে আলাদাএকটি রুমে সরিয়ে ফেলা হয় । ল্যুভ এ শুধুমাত্র মোনালিসাই দুই পরত বুলেটপ্রুফ কাচে বাধাই করে রাখা, সেই ১৯৭৪ সাল থেকে ।
এর পরেও কত ধরনের দূর্ঘটনার শিকার হয়েছে এই অসাধারন শিল্পকর্মটি । চুরি করে নিয়ে যেতেও দ্বিধা করেনি । কিন্তু মোনালিসাকে চুরি কে করবে ? কার এত সাহস ? কারো নেই । কারণ মোনালিসা যে কোনো শিল্প কর্ম নয় । একে কেউই চুরি করে বা অসৎ উদ্দেশ্যে আটকে রাখতে পারবে না । এমনি এক আধ্যাত্মিক শক্তি কাজ করে মোনালিসা‘র মধ্যে ।
মোনালিসাকে ভিন্চি  গড়েছে ৩ বছরেরও বেশী সময় ধরে, যতদূর মনে পড়ে । মোনালিসা সেই সময় অভিজাত পরিবারের সদস্য ছিলো কোনো সন্দেহ নেই । সেই সময় চোখের ভুরু কেটে ফেলা অভিজাত মহিলাদের ফ্যাশনের অংশ ছিলো । সে  কারনেই মোনালিসা‘র চোখের উপরে কোনো ভুরু দেখা যায় না , বা ভিন্চি ভুরু একেঁছিলো , চিত্রটি পরিস্কার করতে গিয়ে বা , সময়ের আস্তরে চাপা পড়ে গেছে । ভুরু থাক বা  না থাক মোনালিসা এমন এক অমর সৃষ্টি যে , ভিন্চির খ্যাতিকেও বাড়িয়ে দিয়েছে বহু মাত্রায় ।
লিওনার্দো মোনালিসা কে একেছে যে পদ্ধতিতে তাকে বলা হয় ’স্ফুমার্তো’ ।
তাতে করে এই প্রথম কেউ আক‍ঁতে পারে এমন ভাবে যে মনে হয়  রক্ত মাংসের মানুষ । এই প্রথম কোনো জীবন্ত পতিকৃতি আকঁলো । যেন মোনালিসা‘র চামড়ার নিচে রক্ত চলাচল দেখা যাবে । এমনি জীবন্ত এক ছবি । যেনো নড়ে চড়ে  বসে,কথা বলে উঠবে ।
মোনালিসা চেয়ারে বসে একটু ঘুরে এমন ভাবে দর্শকের দিকে তাকিয়ে আছে  যেন তাকে কেউ ডেকেছে  বা সে কারো সাথে কথা বলতে চাইছে। আমরা মোনালিসা‘র শরীরে উপরিভাগের তিন চতুর্থাংশ দেখতে পাই । তার দুই হাত চেয়ারের হাতলে এমন আলতো ভাবে রাখা যেনো সে গান শুনছে বা বাইরে কিছু দেখছে  উদাস দৃষ্টি দিয়ে । মোনালিসা’র উদাস করা চোখ ও ঠোটের কোনে মৃদু হাসিই মোনালিসা‘কে করে তুলেছে রহস্যময়ী ।
মোনালিসা এমন এক নারী  চিত্র,  যে কিনা শিল্পকলার ইতিহাসের অনান্য  বিখ্যাত নারীদের মত নগ্ন নয় , বা তাকে কামুকভাবেও ফুটিয়ে তোলা হয়নি । সে ফুলহাতা গাউন পরা , যার গলা ও ঘাড় দৃশ্যমান শুধু, কোনো অলংকারের চিহ্নও নেই  ।  হাতের আঙ্গুলগুলো দেখা গেলেও তাতে কোনো আংটি নেই , যে প্রমানিত করবে যে সে বিবাহিত ছিল । কেও বলে মোনালিসা ছিলো, সুখী বিবাহিত রমণী , যে কিনা গর্ভবতী । কেও বলে মোনালিসা ছিলো অসুখী , তাই তার দৃষ্টি ছিলো উদাস ।
মোনালিসা মাঝারি আকারের একটি শিল্পকর্ম , অনেকগুলা  বিতর্কিত দিকের  একটা হচ্ছে , মোনালিসা‘র প্রতিকৃতি ও মোনালিসা‘র পেছনের নৈস্বর্গিক দৃশ্যকে মেলানো যায় না । অনেকটা জোর করে জোড়া লাগানোর মতো । যেনো কোনো মঞ্চের পর্দা,ভুল  পরিপ্রেক্ষিতে আকাঁ। যা কিনা অদ্ভুত এক মায়াজাল তৈরী করে । আমরা জানি লিওনার্দো দা ভিন্চি হলো   রহস্যের গুরু । তারঁ সব শিল্পকর্মই রহস্যের জালে মোড়া । তাতে করে নাটকীয়তা বেড়েছে বই কমেনি,  সাথে বেড়েছে খ্যাতি । এই কিংবদন্তী শিল্পী লিওনার্দো দা ভিন্চির সৃষ্টি শিল্পকর্মের সংখ্যা খুব একটা বেশী না হলও  তার প্রায় সব গুলোই বিখ্যাত ও আলোচিত ও রহস্যাবৃত।
ইতালীতে মোনালিসা‘কে বলে ‘লা জিওকোন্ডা’ । ‘মিয়া ডোনা’  মানে –মাই লেডি , মিয়া ডোনা লিসা থেকে , ভুল করে সবাই মোনালিসা ডাকতে শুরু করে । মোনালিসা কে দেখলে মনে হয় না সে কোনো কল্পকাহিনীর দেবী, বা মাতৃমূর্তি , বা  একেবারে প্রেমিকার খাটিঁ রূপ, অথবা রেনেসাঁ আমলের বিখ্যাত কোনো ব্যক্তিত্ব বা রাজপরিবারের সদস্য ।
মোনালিসা আমার কাছে এক শুদ্ধতম নারী প্রতিক । তার সৃষ্টিকর্তা লিওনার্দোর অর্ধেক অংশ সে ।   মৃত্যূর পরে লিওনার্দোর রেখে  গেছে  মোনালিসার ভেতরে তার  আত্মাটুকু । তাই আজো আমরা মোনালিসার মাঝে খুজেঁ পায়  ভিন্চির আত্মা , তাইতো এত জীবন্ত সে এবং এত বিখ্যাত ।
পৃথিবী যতদিন  থাকবে ‍ভিন্চি ও মোনালিসাও তত দিন যেনো বেচেঁ‍ থাকে !

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s